ছবি: বাংলাদেশের খবর
বসন্ত এলে ছন্দার মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত রং যেন একসঙ্গে শ্বাস নিতে শুরু করে। গাছের পাতায়, ফুলের পাপড়িতে, আকাশের নীল গভীরতায়, সবখানে এক ধরনের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়ে। অথচ এই আলো যত উজ্জ্বল হতো, তার ভেতরের কোনো এক জায়গা তত বেশি ছায়ায় ঢেকে যেত। সে নিজেও বুঝতে পারত না, এই ছায়া কিসের।
রোকনের সঙ্গে তার পরিচয় বহু আগের। প্রতি বছর একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাদের দেখা হতো। বড় মিলনায়তনের ভিড়, কবিতার আবৃত্তি, বইয়ের স্টলের ঘ্রাণ, এই সব কোলাহলের মাঝেই তারা দূর থেকে একে অপরকে চিনত। সামান্য মাথা নেড়ে শুভেচ্ছা, কখনো চোখাচোখি, কখনো অল্প সময়ের জন্য পাশাপাশি বসে থাকা। এর বাইরে কোনো কথাবার্তা হয়নি কখনো।
এর পেছনে ছিল এক অদৃশ্য দেয়াল, দুজনেই বিবাহিত। সংসার, দায়িত্ব, সামাজিক নিয়ম সব মিলিয়ে সেই দেয়াল ছিল অনেক দৃঢ়। সেই দেয়ালের এপাশে দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছিল। ওপাশে কী আছে, তা জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিংবা সাহস পায়নি।
তবুও প্রতি বসন্তে যখন তাদের দেখা হতো, ছন্দার মনে হতো- এই মানুষটির চোখে যেন এক ধরনের নীরব গভীরতা আছে, যা সে কারো সঙ্গে ভাগ করে না। আর রোকন ভাবত- এই মেয়েটির মুখে প্রশান্তির আবরণ থাকলেও ভেতরে যেন জমে থাকা একরাশ প্রশ্ন। এই ভাবনাগুলো কখনো ভাষা পায়নি। কেবল থেকে গেছে মনের অগোচরে, বসন্তের আগের কুঁড়ির মতো অদৃশ্য, অথচ প্রস্তুত।
এক বসন্তে হঠাৎ করেই এই নীরব সমীকরণ বদলে গেল। সেদিন দুপুরে ছন্দা জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে শিমুল গাছের ডালে আগুনরঙা ফুল ফুটেছে। বাতাসে কাঁচা পাতার গন্ধ। মোবাইলে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ পরিচিত একটি নাম চোখে পড়ল- রোকন।
এক মুহূর্ত থমকে গেল সে। এতদিনের পরিচিত অথচ দূরের মানুষটি হঠাৎ যেন পর্দার ওপারে এসে দাঁড়াল। কৌতূহল আর অজানা এক টানে সে প্রোফাইলে ঢুকে পড়ল। রোকনের টাইমলাইনে ছড়িয়ে ছিল কবিতা, ছোটগল্প, গদ্য ও সংস্কৃতির অনেক চিত্র। কোথাও নদীর ধারে পড়ন্ত বিকেলের আলো, কোথাও একলাইনের কবিতা। কিছু অনুভূতি উচ্চারণের আগেই নীরব হয়ে যায়। ছন্দার মনে হলো- এই মানুষটা শব্দ দিয়ে নিজের নিঃশ্বাসের হিসাব রাখে। অজান্তেই একটি পোস্টে লাইক পড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি বার্তা এলোÑ আপনি কি সেই ছন্দা, যাকে প্রতি বছর সাহিত্য অনুষ্ঠানে দেখি? এই একটি বাক্যেই বহু বছরের নীরবতা ভেঙে গেল। কথা শুরু হলো ধীরে, সংযতভাবে। কেমন আছেন, কেমন চলছে দিন, এই সাধারণ প্রশ্নের আড়ালে জমে থাকা কৌতূহল আর অপেক্ষা লুকিয়ে ছিল। ধীরে ধীরে কথাগুলো গভীর হলো। তারা জানল একে অপরের শৈশব, ছোট ছোট স্বপ্ন, নিঃশব্দ ক্লান্তির গল্প।
রোকন বলল- তার শৈশবের বসন্ত মানেই ছিল নদীর ধারে বসে কাশফুলের দোল দেখা। ছন্দা বলল- তার বসন্ত মানেই ছিল উঠোনে মায়ের পাশে বসে শিমুল তুলো ঝাড়া, আর দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসা আজানের সুর। এই স্মৃতির আদান-প্রদান যেন তাদের ভেতরের কোনো সুপ্ত জায়গায় আলো জ্বালিয়ে দিলো। খুব অল্প সময়েই তাদের মধ্যে তৈরি হলো নামহীন, অঘোষিত, সংযত এক অদ্ভুত সম্পর্ক। তারা জানত, তাদের মাঝখানে দেয়াল আছে। সেই দেয়াল ভাঙার কথা কেউ ভাবেনি। তবু এই দেয়ালের গায়ে বসন্ত এসে লেগেছিল। আলো ফেলেছিল। উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রতিদিন সকালে রোকনের একটি ছোট্ট বার্তা ছন্দার দিন শুরু করত। কখনো কোনো কবিতার লাইন, কখনো আকাশের রঙের বর্ণনা। আর ছন্দা সন্ধ্যায় পাঠাত দিনের ছোট্ট গল্প, বাসের জানালায় দেখা অচেনা মুখ, কিংবা রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতর হারিয়ে যাওয়া ভাবনার কথা। এই কথাগুলো ছিল নিরীহ, অথচ ভেতরে ভেতরে গভীর। তারা কখনো সীমা অতিক্রম করত না। কিন্তু দুজনেই বুঝত- এই সম্পর্ক তাদের জীবনে এমন এক জায়গা দখল করেছে, যেখানে আগে কেউ ছিল না।
একদিন বিকেলে রোকন লিখল- ‘বসন্ত মানুষকে সাহসী করে তোলে, তাই না?’
ছন্দা কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো- ‘হয়তো। বসন্ত এলে অনেক না-বলা কথা মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।’
এই কথোপকথনের পর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো। যেন দুজনেই অনুভব করল- এই না বলা কথাগুলোর ওজন কতটা ভারী। কিছু অনুভূতি প্রকাশ না পেলেও ক্ষত তৈরি করে। এই সম্পর্কও তেমনই এক ক্ষতের জন্ম দিলো। নিঃশব্দ, অদৃশ্য, কিন্তু গভীর। ছন্দা টের পেল, সে আগের মতো সহজে হাসতে পারে না। সংসারের ভেতর সবকিছু ঠিকঠাক চললেও, কোথাও যেন এক ধরনের ফাঁকা পড়ে থাকে। রাতে ঘুমোতে গেলে হঠাৎ রোকনের কোনো কথা মনে পড়ে, অথচ সে নিজেই জানে না, কেন।
রোকনও বুঝতে পারল, তার ভেতরের প্রশান্তি আর আগের মতো অটুট নয়। গভীর রাতে সে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছু লিখবে বলে, কিন্তু লেখে না। কিছু কথার জন্ম হয় না, কিছু অনুভূতির প্রকাশ ঘটে না- এই না পাওয়ার মাঝেই ক্ষত জমে ওঠে।
তারা জানত, এই ক্ষত তাদের নিজেদের পছন্দেই জন্ম নিয়েছে। দেয়াল ভাঙেনি তারা। দায়িত্ব এড়ায়নি। তবু অনুভূতির ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বসন্ত যেমন নিজে থেকেই আসে, তেমনই এই অনুভূতিও নিজস্ব গতিতে এসে পড়েছে। একদিন তারা আবার সেই সাহিত্য অনুষ্ঠানে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলো। সেদিন শহর যেন রঙে ভরে উঠেছিল। কৃষ্ণচূড়ার লাল, আকাশের নীল সবকিছু মিলিয়ে এক মায়াবী আবহ। মিলনায়তনের ভেতরে ঢুকতেই ছন্দার চোখে পড়ল রোকনকে। আগের মতোই শান্ত, সংযত, অথচ চোখে আজ যেন বাড়তি এক ক্লান্তি। তারা পাশাপাশি বসে কবিতা শুনল। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট কথা বলল। এই সামনাসামনি কথার ভেতরেও ছিল এক ধরনের সাবধানতা। যেন প্রতিটি শব্দ বলার আগে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে- দেয়াল আছে।
অনুষ্ঠান শেষে বাইরে দাঁড়িয়ে তারা কিছুক্ষণ নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে সন্ধ্যার মৃদু শীতলতা।
রোকন ধীরে বলল- ‘কিছু সম্পর্ক বোধহয় পূর্ণ না হলেই সুন্দর থাকে।’
ছন্দা তাকাল দূরের রাস্তায়। উত্তর দিলো- ‘হয়তো। পূর্ণ হলে তারা আমাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়।’
এই কথার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অগণিত না বলা অনুভূতি, অস্বীকার করা আকাক্সক্ষা, আর সংযমের দীর্ঘ ইতিহাস। এরপর সময় আবার নিজের নিয়মে চলতে শুরু করল। বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম এলো, বর্ষা এলো, শরৎ এলো। প্রকৃতি বদলালো, দিন বদলালো। তাদের জীবনও নিজ নিজ ছকে ফিরে গেল। তবু সেই ক্ষত রয়ে গেল। গভীরে, নীরবে।
ছন্দা মাঝে মাঝে টের পায়- কোনো ফুল দেখলে তার বুক হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। কোনো বিকেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে অকারণে মন খারাপ হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না, এই মন খারাপের উৎস কোথায়। শুধু জানে, কোথাও একটা ফাঁকা আছে।
রোকন মাঝেমধ্যে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে। জলের স্রোত দেখে মনে হয়, তার ভেতরেও এমন কোনো স্রোত বয়ে চলেছে নিরন্তর, অথচ শব্দহীন। সে জানে, এই স্রোতের কোনো গন্তব্য নেই।
তারা যোগাযোগ রাখে। আগের মতো নিয়মিত নয়। কখনো দীর্ঘ নীরবতা, কখনো হঠাৎ একটি ছোট বার্তা ‘আজ আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর’। এই একটি বাক্যেই দুজন বুঝে নেয় দেয়ালের ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
বসন্ত এলে ছন্দা জানালার পাশে বসে নতুন পাতার দিকে তাকায়। তার মনে হয়, এই পাতাগুলোর ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে তার অপ্রকাশিত গল্প, তার নিঃশব্দ ক্ষত। আর সেই ক্ষত নিয়েই সে বেঁচে থাকে সংসারের দায়িত্ব পালন করে, হাসে, কথা বলে, অথচ ভেতরে ভেতরে একা।
রোকন বসন্তের বিকেলে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাতাসে চোখ বুজে নেয়। তার মনে হয়, কিছু অনুভূতি কখনো পূর্ণ হয় না। তারা কেবল থেকে যায় মানুষের ভেতরের সবচেয়ে নীরব জায়গায়।
এইভাবেই তারা দুজন বেঁচে থাকে দেয়ালের এপাশে দাঁড়িয়ে, বসন্তের উষ্ণতা বুকে ধরে, আর হৃদয়ের গভীরে বহন করে এক অদৃশ্য ক্ষত।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

