Logo

জীবনানন্দ

বাংলা সাহিত্যে ভাওয়াইয়া গানের অবদান ও দার্শনিক পুনর্পাঠ

Icon

এনাম রাজু

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১১

বাংলা সাহিত্যে ভাওয়াইয়া গানের অবদান ও দার্শনিক পুনর্পাঠ

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যচর্চার ইতিহাস মূলত দুটি বৃহৎ ধারায় বিভক্ত- লিখিত সাহিত্য ও লোকসাহিত্য। এই দুই ধারার মধ্যে লোকসাহিত্য অধিক প্রাচীন, অধিক স্বতঃস্ফূর্ত এবং অধিক জীবনঘনিষ্ঠ। কারণ এটি কোনো নির্দিষ্ট লেখকের সৃষ্ট নয়। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অভিজ্ঞতা, বেদনা, আনন্দ ও স্বপ্নের সম্মিলিত প্রকাশ। এই লোকসাহিত্যের বিস্তৃত ভাণ্ডারের মধ্যে ভাওয়াইয়া গান একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংগীতধারা নয়; বরং উত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনদর্শন, ভাষা, সমাজ ও অনুভূতির এক জটিল ও গভীর দলিল।

ভৌগোলিকভাবে ভাওয়াইয়ার বিস্তৃতি হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চল থেকে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা পর্যন্ত প্রসারিত। বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ, বিশেষত কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী; ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি এবং আসামের গোয়ালপাড়া অঞ্চল, এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ভাওয়াইয়ার মূল পরিসর। এই অঞ্চলের প্রকৃতি- নদী, চরভূমি, বালুচর, তৃণভূমি এবং মৌসুমি বন্যা মানুষের জীবনকে যেমন গড়ে তুলেছে, তেমনি তার আবেগ ও কল্পনাকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে ভাওয়াইয়া গান প্রকৃতি ও মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য সহাবস্থানের প্রতিফলন।

ভাওয়াইয়া শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ থাকলেও এর সঙ্গে ‘ভাব’ বা ‘আবেগ’-এর সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। এই ‘ভাব’ কোনো অতীন্দ্রিয় অনুভূতি নয়; বরং এটি গভীরভাবে পার্থিব। প্রেম, বিরহ, দেহাত্মক আকাক্সক্ষা, বঞ্চনা এবং অনিশ্চয়তার অনুভূতি। আবার অনেক গবেষকের মতে, ‘ভাওয়াই’ বা তৃণভূমি অঞ্চলে মহিষপালকদের গাওয়া গান থেকেই ‘ভাওয়াইয়া’ শব্দটির উদ্ভব। এই দুই ব্যাখ্যা মিলিয়ে বলা যায়, ভাওয়াইয়া হলো এমন এক সংগীতধারা যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাস্তবতা ও মানবিক আবেগের সম্মিলনে গড়ে উঠেছে। এটা আমার নিজস্ব অভিমত বলা যেতে পারে। 

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ভাওয়াইয়া গানের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে ব্যবহৃত কামতাপুরী বা রাজবংশী উপভাষা বাংলা ভাষার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র প্রদান করে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার উৎস অনুসন্ধানে আঞ্চলিক উপভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন এবং সেই আলোচনার প্রেক্ষিতে ভাওয়াইয়া গানের ভাষা একটি জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই গানে এমন বহু শব্দ ব্যবহৃত হয় যা প্রমিত বাংলায় বিলুপ্ত বা বিরল। যেমন ‘মেষাল’, ‘গাড়িয়াল’, ‘নিদয়া’, ‘বগা’ ইত্যাদি। এসব শব্দ কেবল অর্থ বহন করে না; এগুলো একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বাস্তবতা, পেশাগত পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে।

ভাওয়াইয়া গানের মূল আবেগিক কেন্দ্র হলো বিরহ। তবে এই বিরহ কোনো বিমূর্ত বা আধ্যাত্মিক অনুভূতি নয়; এটি অত্যন্ত বাস্তব, সামাজিক এবং দেহাত্মক। জীবিকার প্রয়োজনে পুরুষদের দূরযাত্রা, নদীভাঙনের কারণে স্থানচ্যুতি কিংবা দারিদ্র্যের চাপ-এসব বাস্তবতার ফলে সৃষ্ট বিচ্ছেদই ভাওয়াইয়ার বিরহকে গভীর করে তোলে। এখানে প্রেম কেবল রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে ভাওয়াইয়ার বিরহকে একটি সমাজতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা হিসেবেও দেখা যায়।

প্রকৃতি ভাওয়াইয়া গানের একটি অপরিহার্য উপাদান। নদী, আকাশ, বৃষ্টি, কদমগাছ কিংবা পাখি-এসব উপাদান নিছক অলঙ্কার নয়। বরং মানুষের আবেগের সক্রিয় অংশীদার। উদাহরণস্বরূপ, নদীর স্রোতকে জীবনের প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা পাখির বন্দিত্বকে মানুষের সামাজিক সীমাবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা।এইসব চিত্রকল্প ভাওয়াইয়াকে গভীর সাহিত্যিক মাত্রা প্রদান করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাওয়াইয়া গানের প্রকৃতিকে একটি ‘সহানুভূতিশীল সত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যা মানুষের দুঃখ ও আনন্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে।

ভাওয়াইয়া গানে নারীর উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে নারী কেবল প্রেমের বস্তু নয়। বরং সে নিজেই বর্ণনাকারী, অনুভবকারী এবং অভিজ্ঞতার কেন্দ্র। এই গানে নারীর কণ্ঠে যে আকাক্সক্ষা, বেদনা ও প্রতিবাদ প্রকাশ পায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই সমসাময়িক সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে অতিক্রম করে। ফলে ভাওয়াইয়াকে নারীর অন্তর্জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। একই সঙ্গে এতে সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলনও দেখা যায়। মহাজন, জমিদার, শ্রমজীবী মানুষের সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য গানগুলোর অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে।

ভাওয়াইয়ার রূপক ও প্রতীক ব্যবহারের ধরন অত্যন্ত স্বতন্ত্র। এখানে জটিল দার্শনিক ধারণাকে সহজ ও পরিচিত উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। দোতরার তার, গরুর গাড়ি, নদীর ঢেউ, কিংবা পাখির উড়ান। এসব উপাদান মানুষের অনুভূতির প্রতীক হয়ে ওঠে। এই সরলতার মধ্যেই ভাওয়াইয়ার গভীরতা নিহিত। কারণ এটি সাধারণ অভিজ্ঞতাকে সার্বজনীন অর্থে উন্নীত করতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্যই ভাওয়াইয়াকে আধুনিক সাহিত্যিক প্রতীকবাদের সঙ্গে তুলনীয় করে তোলে, যদিও এর শিকড় সম্পূর্ণ লোকজ।

ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হলেও কুড়িগ্রাম অঞ্চল ভাওয়াইয়া চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। এই অঞ্চলের নদীবিধৌত পরিবেশ, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা নদীর প্রভাব, মানুষের জীবন ও সংগীতচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নদীভাঙন, বন্যা ও দারিদ্র্যের মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা ভাওয়াইয়া গানের বেদনা ও সুরে প্রতিফলিত হয়েছে। এই অঞ্চলের শিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ধারাকে লালন করে আসছেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদ ভাওয়াইয়াকে বৃহত্তর শ্রোতামণ্ডলীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ভাওয়াইয়ার ভিতরে বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। ‘চটকা’ ধরনের গানে দ্রুত লয়ের মাধ্যমে হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও দৈনন্দিন জীবনের হালকা দিকগুলো ফুটে ওঠে। অন্যদিকে দীর্ঘ সুরের গানগুলোতে গভীর বেদনা, বিরহ এবং দার্শনিকতা প্রকাশ পায়। এই দুই ধারার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ই মানুষের জীবনানুভূতির ভিন্ন ভিন্ন দিককে তুলে ধরে। ফলে ভাওয়াইয়া একটি বহুমাত্রিক শিল্পরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

ভাওয়াইয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অন্তর্নিহিত প্রতীকবাদ। এখানে পাখি, ফাঁদ, নদী বা পথÑএসব উপাদান মানুষের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রতীকগুলো সরল হলেও গভীর অর্থবহ, যা শ্রোতাকে ভাবনার একটি বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যায়। এই দিক থেকে ভাওয়াইয়াকে লোকজ প্রতীকবাদের একটি সমৃদ্ধ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

বাংলা কথাসাহিত্যে ভাওয়াইয়ার প্রভাব সুস্পষ্ট। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর রচনায় উত্তরবঙ্গের ভাষা, সংস্কৃতি ও লোকজ সুরের যে ব্যবহার দেখা যায়, তা ভাওয়াইয়ার ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই প্রভাব প্রমাণ করে যে ভাওয়াইয়া কেবল অতীতের একটি সাংস্কৃতিক নিদর্শন নয়; বরং এটি আধুনিক সাহিত্যচর্চার একটি সক্রিয় উপাদান।

বিশ্বসংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ভাওয়াইয়ার সঙ্গে বুুজ সংগীতের একটি সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। উভয় ধারাতেই প্রান্তিক মানুষের বেদনা, বঞ্চনা ও সংগ্রাম সুরের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই মিল ভাওয়াইয়ার বিশ্বজনীন আবেদনকে নির্দেশ করে। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও এই গানের আবেগ আন্তর্জাতিক শ্রোতার কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ভাওয়াইয়া নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনোদনমাধ্যমের প্রভাবে লোকগানের চর্চা অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। তবুও স্থানীয় শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং গবেষকদের প্রচেষ্টায় এই ধারাটি এখনো টিকে আছে। একে সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, গবেষণা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, ভাওয়াইয়া বাংলা সাহিত্যের একটি অপরিহার্য লোকায়ত ভিত্তি, যা প্রান্তিক মানুষের জীবন, প্রেম, প্রকৃতি ও সংগ্রামের এক গভীর প্রতিফলন। এটি কেবল সংগীতধারা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ঐতিহ্য। যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিকড়কে শক্তভাবে ধারণ করে আছে। ভাওয়াইয়ার ধারাবাহিক চর্চা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা মানে বাংলা সাহিত্যের একটি মৌলিক শক্তিকে রক্ষা করা। এই শিল্পরূপ বেঁচে থাকলে বাংলা সাহিত্য তার মাটির সংযোগ ও মানবিক গভীরতা অটুট রাখতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন