ছবি: সংগৃহীত
মানুষ আনন্দ করবে, মানুষ আনন্দে থাকবে এটাই স্বাভাবিক, এটাই সুন্দর। আনন্দহীন মানুষ জড় পদার্থের মতো। জড় পদার্থের ভিতর কোনো উৎসব, কোনো আনন্দ নেই। জড় পদার্থ একরকম থেকে থেকে অবশেষে অকেজো হয়ে যায়, অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়, ক্ষয়ে যায়। মানুষ কিছু রেখে যেতে পারে। তার অনুপস্থিতিতেও অন্যরা থাকে অনুভব করতে পারে।
বাংলাদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণ। বাস্তবে তেরো না, আরও বেশি আচার-অনুষ্ঠান, পালা-পার্বণ পালিত হতো বাঙালির ঘরে ঘরে। নানারকম সুস্বাদু খাবারের আয়োজন চলত। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে আনন্দ করে খেতো। বাঙালিরা অতিথিপরায়ণ এই সুখ্যাতিটাও আছে। ঘরে কিছু থাক বা না থাক, অতিথি এলে বাঙালির মনে খুশির ঢেউ ওঠে। ধারদেনা করে হলেও অতিথিকে আপ্যায়নের ক্রটি রাখে না।
বাঙালি আচার-অনুষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই অসাম্প্রদায়িক। এ কারণে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রভেদে সবাই বিভিন্ন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিত, দেখা-সাক্ষাৎ হতো, আলাপ-আলোচনা হতো, সবার মাঝে গড়ে উঠত আত্মার বন্ধন। এর ফলে সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানগুলোও আর সাম্প্রদায়িক থাকত না। এক সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের আমন্ত্রণ করা হতো, আপ্যায়ন করা হতো। খুব বেশি পেছনে যেতে হবে না। আমরা যারা এখন মধ্যবয়সে আছি, আমরা যদি আমাদের শৈশব-কৈশোর স্মরণ করি তাহলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সেইসব সুন্দর, মনোরম দৃশ্যাবলী। হ্যাঁ, ঈদের দিন আমাদের বাড়িতে অন্য সম্প্রদায়ের বন্ধুরা আসতো, নতুন কাপড় পরেই তারা আসত। আমাদের সাথে ঘুরত, আনন্দ করত, সেমাই-পায়েস, কোর্মা-পোলাও খেত। আর পুজোয় তো আমাদের প্রচুর আনন্দ হতো। মুরুব্বিরাই আমাদে সাজিয়ে দিতেন পুজোর অনুষ্ঠানে যেতে। আমরা যেতাম। কেনাকাটা করতাম। নাচ-গান-নাটক ইত্যাদি উপভোগ করতাম।
কেমন করে যেন কী হয়ে গেল আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িক রেখা পুরু হতে লাগল। পুরু হতে হতে এখন তো রীতিমতো দেয়াল উঠে গেছে। এখন আমাদের ঈদে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ আমন্ত্রিত হয় না। কেন হয় না? হলে কি ভালো হতো না? পুজো বা অন্য সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানেও আমাদের যেতে কত বিধিনিষেধ। দু’বছর আগে আমি বড়দিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম সপরিবারে, আমাদের এক প্রতিবেশীর আমন্ত্রণে। সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। সব নেতিবাচক মন্তব্য। পোস্ট ডিলিট করতে হয়েছে।
আমরা কেন বিভেদের সীমারেখা টানি? ধর্ম-বর্ণ-গোত্রভেদ হয়তো আছে। কিন্তু মানুষ হিসেবে সবার চেয়ে বড়, প্রধান ও সাধারণ একটা পরিচয় তো আমাদের আছে। আমরা যে ধর্মেরই হই, যে বর্ণেরই হই, যে গোত্রেরই হই আমরা কি কেউ অস্বীকার করতে পারব যে, আমরা মানুষ না? সেই মানবিক দিক বিবেচনায় আমরা তো যে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারি, যে কারও সাথে বসতে পারি, হাসিমুখে কথা বলতে পারি। আমাদের এই সোনার বাংলার অসম্প্রদায়িক আচার-অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার পথে, অনেক তো বিলুপ্তই হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক আচার-অনুষ্ঠানগুলো ঘিরে রাখা হয়েছে সুকঠিন প্রাচীর দিয়ে। তাহলে আমাদের মানুষ নামের সাধারণ পরিচয়, তারপর বাঙালি বা বাংলাদেশি নামের আরেকটি সাধারণ পরিচয় থাকে কেমন করে?
এই বাংলাদেশে এক সময় সারা বছর ধরে জারিগান, সারিগান, কবিগান, বাউলগান, কীর্তন, গম্ভিরা, যাত্রাপালা, ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড় দৌড়, নৌকা বাইচ, লাঠিখেলা, যাত্রাপালা, মঞ্চ নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। এর কোনোটাই-ই সাম্প্রদায়িক দিক থেকে হতো না। সব মানুষ অংশ নিতে পারত। অনেকদিন ধরেই এসব অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুকৌশলে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল, তারপর একটা গোষ্ঠিী এক সময় এসবের বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে শুরু করে। ধর্মের অজুহাতে নানারকম বিধিনিষেধ টানা হয়। ধর্মভীরু সরলপ্রাণ মানুষ তাদের কথা শোনে। আর কিছুদিন যাবৎ শুরু হয়েছে পেশী শক্তি প্রয়োগ। পেশী শক্তি প্রয়োগ করে সরাসরি বন্ধ করা হচ্ছে অনেক অনুষ্ঠান, শিল্পী ও আয়োজক গোষ্ঠীকে দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতি। অতিসম্প্রতি কিছু মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে যা গোটা দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষকে স্তম্ভিত করে ফেলেছে। শহুরে মানুষও এখন মঞ্চ নাটক দেখতে, সিনেমায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, চিত্র প্রদর্র্শনীতে, উচ্চাঙ্গ সংগীত অনুষ্ঠানে যায় না বললেই চলে। নৃত ও সংগীত চর্চা যেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হতে চলেছে।
এই সুন্দর দেশে কি আনন্দ বলে কিছু থাকবে না? শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কি থাকবে না? শিল্পী, সৃজনশীল মানুষ কি তৈরি হবে না?
একটা দোয়েল মনের আনন্দে গান করছে। সে গান সবারই ভালো লাগার কথা। তারপরও যদি কারও ভালো না লাগে সে জন্য তো দোয়েল পাখিটা দায়ী নয়। যার ভালো লাগবে না তার হৃদয়ের সংকীর্ণতা দায়ী। নিষ্প্রাণ কঠিন হৃদয়ের মানুষটা সে পাখি এবং পাখির গানকে এরিয়ে যেতেই পারে। কিন্তু কিছুতেই সে পাখিকে গান বন্ধ করতে বলতে পারে না, গান বন্ধ করতে শক্তি প্রয়োগ তো করতেই পারে না।
একটা হলদে পাখি একাকী এক বৃক্ষ শাখায় বসে আছে। একজন পাখিটাকে শুধুই একটা পাখি হিসেবে দেখে চলে গেল। আরেকজন রঙ-তুলির আঁচড়ে পাখিটার ছবি এঁকে ফেলল। আরেকজন পাখিটাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলল। আরেকজন পাখিটাকে নিয়ে একটি গান লিখে সুর করল। আরেকজন পাখিটার শৈল্পিক একটা আলোকচিত্র তুলে রাখল। আরেকজন পাখিটাকে নিয়ে গবেষণা করবে বলে ঠিক করল। একটা পাখি। কয়েকজন মানুষ। পাখিটা বিষয়ে তাদের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা, ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়াকর্ম।
যে মানুষটা পাখিটাকে শুধুই একটা পাখি ভেবে চলে গেল সে বলতেই পারে, পাখির ছবি আঁকার কোনো মূল্য নেই, এই আঁকা নিরর্থক। এমনটি বলা খুব সহজ। তবে এই আঁকাটা যে, কতটা কঠিন, কতটা সাধনার কাজ, কতটা চিন্তাশক্তি প্রয়োগের কাজ তা সেই শিল্পবোধহীন মানুষটা বুঝতে পারবে যদি আঁকতে যায়। তুলির আঁচড়ে, রঙের খেলায় পাখির একাকিত্বের দুঃখ বা সুখ প্রকাশ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তেমনি পাখির শৈল্পিক আলোকচিত্র তোলা, পাখিটাকে নিয়ে একটা কবিতা লেখা, একটা গান তৈরি করা, পাখিটাকে নিয়ে গবেষণা করা এর কোনোটাই সহজ নয়। এসব কাজের জন্য প্রথমে থাকতে হবে শৈল্পিক, সৃজনশীল, চিন্তাশীল মন। একটা বাদ্যযন্ত্রের ভিতর থেকে সুমধুর সুর বের করে আনতে কতটা সাধনার দরকার হয় তা বাদক ছাড়া কেউ বুঝবে না।
এখানে বলবো, প্রথম লোকটির চেয়ে বাকি অন্যরা চিন্তা-চেতনায়-শিল্পে অনেক এগিয়ে। তাই বলে এসব শিল্পী লোকটাকে তাদের শিল্পকর্ম দেখতে বা তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে ভাবতে বলছে না। এখন লোকটা যদি গায়ে পড়ে তাদের সাথে ঝগড়া করতে আসে যে, এসব করা যাবে না, এসব করতে দেব না, এসব আমরা প্রতিহত করবো তাহলে সেটা কি অন্যায় নয়?
সংস্কৃতি সুন্দরের চেতনার দুয়ার খুলে দেয়। শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ করে কিছু লোক সুন্দরের চেতনার দুয়ার বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে। জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। রাষ্ট্রও যেন নির্বিকার। শিল্প-সংস্কৃতিকে ঘিরে এই যে একের পর এক আঘাত আসছে, শিল্পীরা অসহায় হয়ে যাচ্ছে, শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষ স্তব্ধ^ হয়ে বসে আছে। রাষ্ট্রের যেন করার কিছুই নেই। বিজ্ঞান-গবেষণায় আমরা এমনিতেই পিছিয়ে আছি। বিজ্ঞান-গবেষণার সুযোগ আমাদের দেশে তেমন নেই। আমাদের দেশের মানুষ অনেকেই সহজাতভাবে শিল্পী। তাই সংগীত, অভিনয় বা শিল্পের অন্যান্য দিকে আমাদের অগ্রগতি ছিল ও আছে। বহির্বিশ্বেও আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি আবেদন যথেষ্ট। তবে কেন এই কালো হাতের ছায়া?
শিল্প নেই মানে আনন্দ নেই। শিল্পী নেই মানে আনন্দের স্রষ্টা নেই। আনন্দহীন আত্মা মৃত। রাষ্ট্র পরিচালকদের এখনই শতভাগ সচেতন হওয়ার সময় আমাদের চিরন্তন, সুন্দর সংস‹ৃতিকে রক্ষা করা, আমাদের শিল্প ও শিল্পস্রষ্টাদের পাশে দাঁড়ানো। একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃত শিক্ষিত সমাজ, শিল্প-সংস্কৃতি প্রিয় মানুষ এবং সরকার সবাইকে একযোগে এ ব্যাপারে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদেরই কর্তব্য।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

