বাংলাদেশে সাংবাদিকতা সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে : মাহফুজ আনাম
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:৪১
ছবি: সংগৃহীত
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেছেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এক ধরনের সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে কোনো গোষ্ঠীর চাপানো মনোভাব থেকে সামান্যতম ভিন্ন কিছু বললেও আক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
আল জাজিরার 'দ্য লিসেনিং পোস্ট' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের মূলধারার গণমাধ্যম অনেক বেশি স্বাধীন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বেশি। গণমাধ্যমের স্বাধীন চিন্তাভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দৃশ্যমান। কিন্তু একইসঙ্গে সেই সর্বগ্রাসী আতঙ্কও রয়েছে—কোনো গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া মনোভাব থেকে সামান্য সরে গেলেই আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।”
মাহফুজ আনাম বলেন, “অনেক সময় আমরা শব্দচয়নেও খুব সতর্ক হই—ভাবি কোন শব্দটি ব্যবহার করব। এটা স্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কৃতির পরিপন্থী হলেও বাস্তবতা এটাই।”
ডেইলি স্টার ভবনে হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “যারা সরাসরি হামলা চালিয়ে ভবনে আগুন দিয়েছে, তারা সম্ভবত ডেইলি স্টারের পাঠক নন। আমার ধারণা, এটি সুপরিকল্পিত। তাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক মোটিভেশন ছিল। গণতন্ত্র, ভিন্নমত ও উদার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ধ্বংস করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।”
তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিবেদনে কোনো ভুল থাকলে সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।” ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতটিকে তিনি ‘চরম আতঙ্কের’ রাত হিসেবে বর্ণনা করেন। “সেই রাতে নিউজরুমের কর্মীরা বলছিল—‘মাহফুজ ভাই, হয়তো আর দেখা হবে না’। তারা বাবা, মা, স্ত্রী ও বন্ধুদের ফোন করছিল, হয়তো আর কখনো দেখা হবে না।”
মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করেন। তবে এতে বিপুল পরিমাণ ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগও তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশেও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক দল আলাদা টিম গঠন করে এ সুযোগ নিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে কিছু বললেই শত শত মানুষ গালি দিতে শুরু করে। ভালো বললেও শত শত মানুষ প্রশংসা করবে। এটি এখন প্রচলিত বিষয়।”
ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতের ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ইনফ্লুয়েন্সার বলেছিল, ‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন’। তারা আমাদের প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অনেক সময় আমাদের বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটের বাইরে তুলে ধরা হয়েছে। এটি অত্যন্ত সচেতন ও শক্তিশালী পদক্ষেপ।”
মাহফুজ আনাম গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণের কারণে জনআস্থা ক্ষয়কে উল্লেখ করে বলেন, “সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত। যার ফলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
তিনি বলেন, “তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর জনগণ এখন চতুর্থটির দিকে এগোচ্ছে। প্রত্যাশা বেশি। জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে।”
মাহফুজ আনাম আল জাজিরাকে বলেন, হাসিনা শাসনামলের শেষ ১৫ বছরকে সংক্ষেপে বোঝানো যায় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ দিয়ে। এটি ভিন্নমতের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট করে। শাস্তির ২০টি বিধানের মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “সরকার কাউকেই ছাড় দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার জন্য গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়েছে। কার্টুনিস্ট ও শিক্ষকদের গ্রেপ্তার, শীর্ষ সম্পাদকীয় কণ্ঠের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিচারিক হয়রানি—সবই ঘটেছে।”
মাহফুজ আনাম বলেন, “হাসিনা আমার বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ আনা হয়েছিল। আমাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে, আয় প্রায় ৪০–৪৫ শতাংশ কমে গেছে। কোনো প্রতিবেদককেই প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান কাভার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আক্রমণ করেছেন।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্ত গণমাধ্যমের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরিতে সহায়ক হবে।

