পিআইবি’র প্রশিক্ষণ
‘সাব-এডিটরকে কোনোভাবেই দলকানা হওয়া যাবে না’
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:০১
প্রশিক্ষণ শেষে সনদ গ্রহণ করছেন প্রশিক্ষণার্থী। ছবি : বাংলাদেশের খবর
একজন রিপোর্টারকে যেমন ন্যায়সঙ্গত, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচনের নিউজ কাভার করতে হবে। তেমনই নির্বাচনী প্রতিবেদন এডিট করার ক্ষেত্রেও সাব-এডিটরকে কোনোভাবেই দলকানা হওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ডেপুটি এডিটর সুলতান মাহমুদ ও সিনিয়র সাংবাদিক জিয়াউর রহমান।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত ‘নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণে’ এ মন্তব্য করেন তারা। পিআইবি মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ও শুক্রবার দুদিনব্যাপী প্রশিক্ষণে অংশ নেন ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিলের ৫০ সদস্য।
প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহিন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সমন্বয়ক সিনিয়র প্রশিক্ষক গোলাম মুর্শেদ, প্রশিক্ষক সিনিয়র সাংবাদিক জিয়াউর রহমান, আমার দেশের উপ-সম্পাদক সুলতান মাহমুদ, ঢাকা সাব এডিটর কাউন্সিলের সভাপতি মুক্তাদির অনিক, সাধারণ সম্পাদক জওহর ইকবাল খান, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক তারেক হোসেন বাপ্পি এবং কোষাধ্যক্ষ নাজিম উদ দৌলা সাদী প্রমুখ।
-6985f39e3eb1a.jpg)
ওবায়দুর রহমান শাহিন বলেন, ‘সাংবাদিকতায় তথ্য যাচাইয়ের অগ্রাধিকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতি-নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই।’
গণভোট, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট ২০২৬, নির্বাচন ও সংবিধান, নির্বাচনী বাজেট, ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরেন সুলতান মাহমুদ।
প্রশিক্ষণের প্রথমদিনে প্রশিক্ষক সুলতান মাহমুদ অংশগ্রহণকারীদের জানান, এবার গণভোট হবে চার বিষয়ে।
১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা। সংসদে নারীর প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন প্রধানন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
তিনি বলেন, ‘জনমত তৈরি করাও সাংবাদিকের কাজ। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা কাউকে বাধ্য করতে পারবে না। সাংবাদিক হিসেবে কারও পক্ষ নিতে পারবে না। দলকানা হলে চলবে না।’
তিনি আরও বলেন, যে সাব-এডিটর যেটা ভালো বোঝেন, তাকেই সেটি সম্পাদনার দায়িত্ব দিতে হবে। নইলে ওয়েল এডিটিং সম্ভব নয়। সাংবাদিকতার ডায়রিতে ‘না’ বলতে কোনো শব্দ থাকা উচিত নয়। সাংবাদিকরা কখনই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেন না। আর রিপোর্টে ভারসাম্য আনার দায়িত্ব একজন সাব-এডিটরের।’
সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘একজন সাব-এডিটর যত বেশি শব্দ জানবে, তিনি তত বেশি ভালো এডিট করতে পারবেন। রিপোর্টার যা কিছুই লিখুক না কেন, সাব-এডিটর সেটা লিবারেল করবে। যেন সেই প্রতিবেদনের মাধ্যমে কেউ আহত না হয়।’
প্রতিবেদনে কারও নাম যেন ভুলভাবে বা বিকৃতি না হয়। তিনি যেটা লেখেন সেটাই লেখার পরামর্শ দেন এই প্রশিক্ষক।
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচন সম্পর্কিত নীতিমালা, নির্বাচনে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়গুলো আলোচনায় তুলে ধরেন জিয়াউর রহমান।
তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। সেই সঙ্গে ২১ জেলায় কমিটি থাকতে হবে। ইসি কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।
তিনি আরও জানান, এবারের নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর গেজেট জারি করেছে সরকার।
এবারের জাতীয় নির্বাচনে যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিধান। সংশোধিত অধ্যাদেশে ‘না ভোট’ পুনরায় চালু হওয়া থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মত নানা বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামি প্রার্থী হতে পারবেন না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী ( সেনা, নৌ, বিমান ও কোস্ট গার্ড) যুক্ত হয়েছে। একক প্রার্থীর আসনে ‘না ভোট’ ফিরছে। সমান ভোট পেলে লটারির বদলে হবে পুনঃভোট। জোটগত নির্বাচনে নিজ দলের প্রতীকে ভোট বাধ্যতামূলক।
এছাড়াও নির্বাচনী জামানত ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদন্ডের বিধান থাকবে। আইটি সাপোর্টে পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়েছে। এআই-এর অপব্যবহার নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে নির্বাচিত হওয়ার পরও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে-এমন বিধান রাখা হয়েছে। এতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জোটগতভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান যুক্ত করাসহ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনীর মধ্যে রয়েছে দেশের বাইরে কোনো প্রার্থীও জন্য নির্বাচনী প্রচারণা করা যাবে না।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে সাংবাদিকরা। গণমাধ্যম সঠিকভাবে কাজ করলে দেশে কোনো দুর্নীতি থাকতে পারে না। নির্বাচন যত সুষ্ঠু হবে গণতন্ত্র তত শক্ত হবে। সে জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্যই সোর্স ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। রিপোর্টার ও সাব-এডিটরের কাজ ফ্যাক্ট চেকের মাধ্যমে সঠিক তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর নিউজ প্রকাশ করা।’
তিনি বলেন, ‘সাব-এডিটরকে চৌকস, দক্ষ ও রিপোর্টারের থেকে বেশি জানতে হবে। আপনি যদি না জানেন, তাহলে কীভাবে এডিটর করবেন? মিডিয়া স্বাধীন না হলে দেশ ও গণতন্ত্র ঠিকবে না। আর স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে কারও লেজুড়বৃত্তি না করা।’
নির্বাচনকালে গণমাধ্যকর্মীদের শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা করেন জিয়াউর রহমান। ভোটকেন্দ্রে নিউজ কাভার করতে যাওয়ার আগে সঙ্গে কী কী নিতে হবে, সেটাও জানান তিনি। ভুয়া তথ্য, অপতথ্য, ভুয়া সংবাদ, হট স্পিচ, গুজব, প্রোপাগান্ডা ইত্যাদি মোকাবিলার ওপর বিষয়ে গুরুত্ব দেন এই প্রশিক্ষক।
দ্বিতীয় দিনের প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের সবার হাতে সনদপত্র তুলে দেন প্রশিক্ষকদ্বয় ও ঢাকা সাব এডিটর কাউন্সিলের নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন
এআরএস

