গণমাধ্যম আর তোষামোদি করুক চাই না: মির্জা ফখরুল
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:০১
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে সংগঠিত হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কেন জানি জাতিগতভাবে আমরা তোষামোদি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। গণমাধ্যম আর তোষামোদি করুক, সেটা আমরা চাই না।’
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া পাঁচ সাংবাদিকের পরিবারকে সম্মাননা ও এক লাখ টাকা করে অর্থসহায়তা দেওয়া হয় এনইসির পক্ষ থেকে।
এসময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘তোষামোদী, মোসাহেবি—এই জিনিসটা আর দেখতে চাই না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওটাই...দেখতে হয়। রাজনীতিতে একই ঘটনা ঘটে। আপনার আমলাতন্ত্রে একই ঘটনা ঘটে। সামথিং রং। আমরা কেন জানি না জাতিগতভাবে বেরিয়ে আসতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদের সময়ে সেই দায়িত্ব পালন না করে গণমাধ্যমের মানুষেরা তোষামোদীতে ব্যস্ত ছিলেন। এই তোষামোদী আর দেখতে না চাইলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো তা দেখতে হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল মনে করেন, জাতিগতভাবে এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে একটা বড় ধরনের বিপ্লবের প্রয়োজন হতে পারে। যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমূল পরিবর্তন আসবে। জুলাই সনদ অনুযায়ী বিএনপি যেসব বিষয় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত করার জন্য চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। কিন্তু কতগুলো বিষয় নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাই সনদে পরিষ্কার বলা আছে, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারছে না, তারা যদি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যায়, তারা সে বিষয়গুলো দলের নির্বাচনী ইশতেহার, সমঝোতাকে প্রাধান্য দেবে। কিন্তু এই বিষয় এখন সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব মনে করেন, যেসব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মতানৈক্য হয়নি, সে বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি কমিটি করা আছে। সংবিধানের যে বিষয়ে পরিবর্তন দরকার, সেটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করতে বিরোধী দল যেন সহায়তা করে।
বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের সময়ে দেশজুড়ে যে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, সেটা একদিনেই সবকিছু শুধরে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, কিন্তু কাজটা শুরু করতে হবে। আমার বিশ্বাস, এই কাজটা আজ শুরু হয়েছে। হয়তো অনেক অপূর্ণতা রয়েছে, অসংগতি রয়েছে। কিন্তু কাজটা শুরু হয়েছে। একেবারে হয়নি—কথা বলা যাবে না।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন এনইসির সভাপতি ও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, আবার যাতে দেশে কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সে জন্য জাতিকে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ রাখার জন্য ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। সম্পাদকদের নতুন এই সংগঠনে ঢাকা ছাড়াও দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্পাদকেরা সমান গুরুত্ব পাবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, ‘দৈনিক বাংলাদেশের খবর’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন, ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির, ‘নয়া দিগন্ত’ সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ‘নিউ নেশন’ সম্পাদক মোকাররম হোসেন, সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এর সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদকে দেশছাড়া করতে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে জুলাই শহীদদের। কিন্তু দেশে কোনো জুলাই শহীদ চত্বর নেই। শেখ হাসিনার পতন দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মতো জাতীয় কোনো স্থাপনা নেই। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান, যাতে একটি জুলাই শহীদ চত্বর গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ সাংবাদিকদের হত্যার বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।
ইংরেজি ‘দ্য ডেইলি ওয়াদার’ সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, জুলাই এখনো শেষ হয়নি। বরং যুগ যুগ ধরে তা চলতে থাকবে। তিনি ঘোষণা দেন, জুলাইয়ে শহীদ পাঁচজন সাংবাদিকের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহনে এনইসির পক্ষ থেকে সব সময় সহযোগিতা করা হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান বলেন, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিগত দিনে তিনি দেখেছেন, গণমাধ্যম যদি ফ্যাসিস্টের তাঁবেদারি না করত, তাহলে শেখ হাসিনা খুনি হওয়ার সাহস করতেন না। জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি। গণমাধ্যম যাতে নতুন কোনো ক্ষমতার তাঁবেদারি না করে, সে জন্য তিনি সবাইকে সজাগ থাকার অনুরোধ জানান।
শহীদ সাংবাদিক হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, তার স্বামী হত্যার দুই বছর পার হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। তিনি হাসান মেহেদী হত্যায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

