ঈদযাত্রা
বখশিসের নামে ৮৩২ কোটি টাকার ‘ভাড়া নৈরাজ্য’
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৫, ১৯:৩৬
ঈদযাত্রায় বখশিসের নামে গণপরিবহনে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ভাড়া নৈরাজ্যের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এবারের ঈদযাত্রায় এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে আগাম কঠোর অবস্থানের জানান দিয়ে আসছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েও কার্যত ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে পারেনি সরকার।
যাত্রী কল্যাণ সংগঠনগুলো বলছে, আসন্ন ঈদে গণপরিবহনে ২২ কোটি ৭৪ লাখ ৯০ হাজার ট্রিপে মানুষের যাতায়াত হবে। সংগঠনগুলো তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, শুধু ঢাকা থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ গ্রামের বাড়ি যাবেন এবার। ঈদবাজারসহ নানান প্রয়োজনে বিভিন্ন গণপরিবহনে বাড়তি ট্রিপ হবে। এরই মধ্যে যাত্রীদের যাত্রা নিরাপদের পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নানামুখী তৎপরতার কথা জানালেও কেবল ঢাকা ছাড়তেই ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এবারের ঈদে ৯৮ শতাংশ গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণের মধ্যে একটি পরিবহন মালিকদের বাড়তি মুনাফার লোভ। মালিকশ্রেণির চাহিদা মেটাতে গিয়েই অনেকটা বাধ্য হয়েও শ্রমিকরা আদায় করছেন অতিরিক্ত ভাড়া। অথচ সড়ক ও নৌ পথের পরিবহন মালিকদের নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিং ভিজিল্যান্স টিম থাকলেও এসব টিমে যাত্রী প্রতিনিধি না রাখায় যাত্রীর স্বার্থ কেউ দেখছেন না বলে অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নৌপথে এবার যাত্রী বেশি। ঢাকার সদরঘাট ও নারায়ণগঞ্জ নদী-বন্দরসহ বিভিন্ন ঘাট দিয়ে ২০০টি ছোট-বড় নৌযানে প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে। যাত্রীপ্রতি গড়ে ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত শ্রেণিভেদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। গড়ে যাত্রী প্রতি ২০০ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া আদায় হলে ঈদের আগে এসব যাত্রীদের কাছ থেকে ৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে।
ওই সূত্র আরও জানায়, ঈদের আগে রাজধানীতে চলাচলকারী ২০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রায় ৩০ লাখ ট্রিপ যাত্রীকে ৬০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। রাজধানীতে চলাচলকারী প্রায় ৮ লাখ ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, প্যাডেলচালিত রিকশায় ৮ কোটি ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে। এই যানবাহনে যাত্রীদের ১৬০ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।
৭ হাজার হিউম্যান হলারে ঈদের আগে প্রায় ৮০ লাখ ট্রিপ যাত্রীকে ঈদ বকশিসের নামে গড়ে প্রায় ২০ টাকা ভাড়া বাড়তি দিতে হবে। সেই হিসেবে ঢাকার হিউম্যান হলারে কেবল ১৬ কোটি টাকার বেশি বাড়তি ভাড়া আদায় হবে। আর প্রাইভেটকার, জিপ ও মাইক্রোবাসে ৬০ হাজার ট্রিপে গড়ে ৩৫০০ টাকা হারে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই হিসেবে এই পরিবহন ব্যবহারকারি যাত্রীদের ২১ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।
ঢাকা থেকে দুরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাসে ৩০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াতে যাত্রীপ্রতি গড়ে ৩০০ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই হিসেবে দুরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাসের যাত্রীদের গুনতে হবে ৯০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভাড়া।
সূত্রটি আরও জানায়, এবারের ঈদে প্রায় ২৫ লাখ যাত্রী মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ি যাবেন। তাদের ৩০ শতাংশ নিজেদের বাইক ব্যবহার করছেন। কেবলমাত্র ঢাকা মহানগরীর ৫ লাখ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে যাত্রী প্রতি গড়ে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০০ টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে ২ কোটি ৫০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর কাছে ২৫০ কোটি বাড়তি ভাড়া আদায় করছে।
ঢাকা থেকে ৮০ হাজার যাত্রী ট্রেনের ছাদে করে বাড়ি যাবেন। তাদের প্রত্যেককে গড়ে কমপক্ষে ১০০ টাকা হারে ৮০ লাখ টাকা রেলে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ‘ঘুষ’ দিতে হবে। খাবার গাড়ি, ইঞ্জিন, দুই বগির মাঝে, কোচের ভেতরে বিনা টিকিটে যাতায়াত করবে আরও প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী। ট্রেনে কর্মরত টিটিই, গার্ড, সরকারি-বেসরকারি ইয়ার্ড, বেসরকারি ক্যান্টিন অপারেটরের লোকজন, ট্রেনে দায়িত্বরত জিআরপি, এনআরবি ও স্টেশনে দ্বায়িত্বরত টিকিট চেকারদের যাত্রী প্রতি গড়ে ৩০০ টাকা হারে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হবে। আকাশপথে যাত্রী প্রতি গড়ে ৩৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিলে ৩৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে।
এ নিয়ে আজ যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি সংবাদ সম্মেলনও আয়োজন করে। সেখানে সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সরকার বাস-লঞ্চ ও বিভিন্ন গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণে চালক, সহকারীর বেতন-ভাতা ও দুই ঈদের বোনাস প্রতিদিনের আদায়কৃত ভাড়ায় ধার্য থাকলেও দেশের কোনো পরিবহনে তা কার্যকর নেই। ফলে ঈদযাত্রায় এবারও নৈরাজ্য বহাল রয়েছে।’ এই ‘লুটপাট’ থামাতে যাত্রীদের নিয়ে শক্তিশালী তদারকি টিম গঠনের সুপারিশও করেন তিনি।
এনএমএম/এমজে

