একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়নের ডাকে পালিত স্বাধীনতা দিবস
আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৫, ২০:৫৭
স্বাধীনতা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙালি জাতি। তবে পরবর্তীতে বারবার সেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কখনো স্বৈরাচার, কখনো ফ্যাসিবাদ জাতির ওপর চেপে বসেছিল। তবে প্রতিটি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর, একাত্তরের স্বাধীনতার চেতনা আবারও জাগ্রত হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ডাক এবারের স্বাধীনতা দিবসে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বুধবার (২৬ মার্চ) সকালে স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ৬টা ৫ মিনিটে স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি।

তারপর সকাল ৬টা ৭ মিনিটের দিকে স্মৃতিসৌধে পৌঁছান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানানো শেষে ৬টা ১৫ মিনিটে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা চলে যাওয়ার পর স্মৃতিসৌধ এলাকা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর সাধারণ মানুষ ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে আসতে থাকেন।
শিশু থেকে প্রবীণ সব বয়সী মানুষ স্মৃতিসৌধে পৌঁছায় এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, আধা-সরকারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ থেকে যুদ্ধাহত অনেক মুক্তিযোদ্ধাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এদিকে, রাজনীতিবিদরা নিজেদের বক্তব্যে একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “৭১ এবং ২৪-এর উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা সুষ্ঠু করা। এ জন্য সবাইকে একত্রে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।”

যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “৭১-এ দেশের জন্ম হয়েছে, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে।’
একই মত পোষণ করেন একাত্তরের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া রাজনৈতিক নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু, যিনি বলেন, "একাত্তর ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম, আর চব্বিশ হচ্ছে স্বাধীনতা পুনঃস্থাপন করার সংগ্রাম।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “একাত্তর ও ২৪ একে অপরের পরিপূরক। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম, মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।”
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “কিছু সংস্কার নির্বাচনের আগেই নির্বাহী আদেশে করা সম্ভব, তবে মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার শুধুমাত্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই করতে পারবেন।”
এদিকে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সকালে লাল পতাকা হাতে একদল লোক আওয়ামী লীগের পক্ষে স্লোগান দিতে শুরু করলে উপস্থিত জনতা তাদের ধাওয়া দেন এবং কয়েকজনকে মারধর করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করে।
এবারের স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। সকাল ১০টার পরে জনসমাগম কিছুটা কমে যায়। বিকেল ৫টার দিকে স্মৃতিসৌধের ফটক বন্ধের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ৪ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োজিত ছিলেন।
মহান স্বাধীনতা দিবসের এই দিনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের মধ্যে নতুন করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।
এমজে

