থমকে গেছে পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তন প্রক্রিয়া
ছবি : সংগৃহীত
পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখন কার্যত থমকে গেছে। গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ সংস্কারের দাবি উঠলে তার অংশ হিসেবে লোগো এবং পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে পুলিশের লোগো থেকে নৌকা বাদ দিয়ে নতুন লোগো প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখনও অনেক জায়গায় পুরোনো লোগোই ব্যবহৃত হচ্ছে। পোশাক পরিবর্তন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন পোশাকের মডেল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পরিকল্পনাটি। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রক্রিয়াটি বেশি দূর এগোয়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং বাজেট সংক্রান্ত আপত্তির কারণেও উদ্যোগটি থমকে গেছে। এমনকি খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই জানে না—এখন এই প্রক্রিয়া কোন অবস্থানে আছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বাংলাদেশের খবরকে জানায়, ‘পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন সেটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি মন্ত্রণালয়েরও অজানা। এখন কেবল সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোই প্রকৃত অগ্রগতি জানাতে পারবে।’
তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, প্রক্রিয়া থেমে নেই। একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খুব দ্রুতই নতুন পোশাক পাওয়া যাবে। তবে তা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
অন্যদিকে আনসার সদর দপ্তর জানায়, আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে কার নির্দেশে এবং কেন তা স্থগিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র মো. আশিকুজ্জামান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে আমরা অবগত। তবে এখনও বাস্তবায়নের কোনো নির্দেশনা পাইনি।’ তিনি বাহিনীর মহাপরিচালকের (ডিজি) বরাতে জানান—এ পরিকল্পনা স্থগিত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশি কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে পুলিশের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে পোশাক ও লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় রাস্তায় পুলিশ সদস্যরা উর্দি পরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করলেও, থানা ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে অনেকেই সাদা পোশাক ব্যবহার করেন। অনেকে ইউনিফর্ম নিয়ে অস্বস্তির কথাও জানান। এসব কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করে বিষয়টি পর্যালোচনা করে।’
তবে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ‘পোশাক একটি মানসিকতা তৈরি করে। তাই পরিবর্তন জরুরি।’ অপরদিকে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন—‘পোশাক পরিবর্তনে পারফরম্যান্স বদলাবে কি?’ এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয় বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, পুলিশের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। পোশাক বাহিনীর পক্ষ থেকেই সরবরাহ করা হয়। এত বিপুল সংখ্যক সদস্যের নতুন পোশাক তৈরিতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়বে। পাশাপাশি লোগো পরিবর্তনের ফলে স্থাপনা, যানবাহন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন লোগো প্রতিস্থাপন করতেও আলাদা ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ব্যয় অনুৎপাদনশীল খাতে পড়ায় সেটি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এছাড়া মাঠ পর্যায়েও নতুন পোশাক ও রঙ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গোপন ভোটের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর নতুন রঙ নির্ধারণ করা হয় ‘আয়রন কালার’ (লোহার মতো ধূসর)। তবে অনেকেই বলছেন, এটি বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী নয়। ময়লা সহজে জমে যায় এবং দেখতে ধূসর, নিরানন্দ। র্যাবের জন্য নির্ধারিত হয় জলপাই (অলিভ) রঙ, আর আনসারের জন্য সোনালি গম (গোল্ডেন হুইট) রঙ।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘পোশাক পরিবর্তনে কার্যকলাপের বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না। বরং এটি বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়েও বিতর্ক হওয়ায় হয়তো বিষয়টি থমকে দাঁড়িয়েছে।’ তারা বলেন, ‘পোশাক নয়, সংস্কার প্রয়োজন ভেতর থেকে।’
তারা আরও বলেন, বাহিনীতে বড় কোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সাধারণ সদস্যরাও কিছু না কিছু জানতে পারেন। কিন্তু পোশাক পরিবর্তনের ঘোষণা আসার পর আর কোনো অগ্রগতি তারা জানেন না।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘পোশাক পরিবর্তনের কাজটি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। ফেব্রিকস, টেন্ডারসহ কোনো প্রক্রিয়ায় জটিলতা নেই। বরং বাজেটও অপরিবর্তিত রয়েছে—শুধু রঙ ও লোগোর পরিবর্তন হচ্ছে। থমকে গেছে এমন নয়, অগ্রগতি চলমান। খুব সহসাই নতুন পোশাক পাবে বাংলাদেশ পুলিশ।’
লোগো পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লোগো পরিবর্তন অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও পুরোনো লোগো থাকলেও তা ভুল বা জটিলতার কারণে। ধাপে ধাপে সব জায়গায় নতুন লোগো বসানো হবে। পুরোনো লোগো আর কোথাও থাকবে না।’
এনএমএম/এএ


