-68b10e2327f25.png)
কর্মস্থলে শ্রমিক মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের কর্মপরিবেশে বিদ্যমান নিরাপত্তাহীনতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে প্রতি বছর এসব মৃত্যুর পেছনে দেখা যায় কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশিক্ষণের অভাব ও তদারকির ঘাটতি। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি জানা সত্ত্বেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে কর্মস্থলে শ্রমিক মৃত্যুর হার কমছে না।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন ২০২৫) কর্মস্থল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২২ জন শ্রমিক। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৭৫ জন। যদিও সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এটি কোনো কার্যকর অগ্রগতির প্রতিফলন নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতাই ফুটে উঠেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ৩৭৩টি দুর্ঘটনায় ৪২২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পরিবহন খাতে— এখানে মারা গেছেন ২০৭ জন শ্রমিক।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরিবহন খাতে ২০৭ জন, সেবামূলক খাতে ৬৫ জন, কৃষি খাতে ৫৯ জন, নির্মাণ খাতে ৫৯ জন এবং কারখানা ও উৎপাদন খাতে ৩২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে এসআরএসের নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, এখনো শ্রমিক মৃত্যুর প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। এছাড়া বজ্রপাতে ৫৬ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৪০ জন, ভবন থেকে পড়ে ২৩ জন, আগুন ও বিস্ফোরণে ১২ জন, ভারী বস্তুর আঘাতে ৯ জন, মাটি বা দেয়াল ধসে ৮ জন, পানিতে ডুবে ৫ জন এবং বিষাক্ত গ্যাসে ১ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
এসআরএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে দুর্বল অবকাঠামো, বেপরোয়া যান চালনা ও অদক্ষ চালক, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মালিকপক্ষের গাফিলতি, দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও বিশ্রামের অভাব উল্লেখযোগ্য।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে কর্মস্থলে ৭৫৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৭৫ জন এবং ২০২২ সালে ১ হাজার ৪৩২ জন। ২০২২ সালের মৃতদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিক ছিলেন ১ হাজার ১০৩ জন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মস্থলে শ্রমিক মৃত্যুর এ মিছিল থামাতে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপাক্ষিক সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এসআরএসের নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাতভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, মালিকের দায়িত্ব সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করা, সরকারের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন ও কার্যকর তদারকি করা এবং শ্রমিকদের দায়িত্ব নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা।
এমএইচএস