Logo

জাতীয়

কমছে সামুদ্রিক মাছের মজুত

Icon

তরিকুল ইসলাম সুমন

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ১০:০০

কমছে সামুদ্রিক মাছের মজুত

রু-ইকোনমির অন্যতম সম্পদ হলো মাছ। অপরিকল্পিত ও ৪০ মিটার গভীরতায় মৎস্য আহরণের কারণে কমছে সামুদ্রিক মাছের মজুত। হুমকির মুখে রয়েছে সামুদ্রিক সাদামাছ, চিংড়ি, পোয়াসহ ইলিশ মাছ। এ কারণে নিয়ন্ত্রিত আহরণে জোর দিচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক 'বাংলাদেশ মেরিন ফিশ স্টক অ্যাসেসমেন্ট' প্রতিবেদনে মাছ কমে যাওয়ার তথ্য আসায় নড়ে চড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়সহ মৎস্য অধিদপ্তর।

অন্যদিকে বিপদ বাড়াচ্ছে সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য ইকো সাউন্ডার বা সোনার মেশিন ব্যবহার। এ মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার। এ জন্য গত মঙ্গলবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোনার মেশিন ব্যবহারে জলের গভীরতা, পানির নিচের গঠন এবং মাছের ঝাঁক শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এটি শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে মাছের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং ফিশ ফাইন্ডার হিসেবে কাজ করে, যা জেলেদের মাছ খুঁজে পেতে এবং তাদের জালের সঠিক স্থানে ব্যবহার করে মাছ ধরতে সহায়তা করে।

সোনার যন্ত্র ব্যবহার করে জেলেরা কম সময়ে বেশি মাছ ধরতে পারে, কারণ তারা কোথায় মাছ আছে তা জানতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাছ ধরার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও শক্তি সাশ্রয় হয়, যা জেলেদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করে। এটি বিপজ্জনক এলাকা এবং অন্যান্য বাধা শনাক্ত করতে সাহায্য করে, যা জেলেদের নিরাপদ থাকতে সহায়তা করে।

বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রায় এক ঘণ্টার উপরে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়েছে। উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায়, সমুদ্রের অঞ্চলভিত্তিক মাছের মজুত, গভীরতায় জাহাজ চলাচল, নিয়ন্ত্রণ, সরকারি অনুমোদন, বাণিজ্যিক মৎস্য জাহাজ, লাইসেন্স নেওয়া, জাহাজের ক্ষমতা, সমুদ্রের ৪০ মিটারের বাইরের গভীরতায় গমন, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, কম গভীরতায় বেশি মাছ ধরার কারণে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেছে। ৪০ মিটারের মধ্যে মাছের প্রাচুর্য কম। এ জন্য গভীর সমুদ্রে যেতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক মাছ ধরার জাহাজগুলো সোনার মেশিন ব্যবহার করে মাছ ধরার কারণেও মাছ কমে যাচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে সমুদ্রে মাছ ধরার পরিমাণ নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা। এখন কমিটি গঠনের কাজ শুরু হবে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সমুদ্রে অনিয়ন্ত্রিত আহরণের কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ফিনফিশ বা সাদা মাছ। যেখানে আগে ৩ লাখ ১ হাজার ১১৩ টন আহরণ করা হতো। গত বছর মজুত ও আহরণযোগ্য মাছের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন। যা আগের তুলনায় ৫১ হাজার ১১৩ টন কম।

অন্যদিকে, বিভিন্ন ধরনের চিংড়িও রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। আগে যেখানে ৪৬ হাজার ৩২৩ টন আহরণ করা হতো। বর্তমানে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার টনে, যা আগের তুলনায় ৮ হাজার ৩২৩ টন কম। ক্রোকারস (পোয়া) এটি মধ্যম ঝুঁকিতে থাকলেও কমানো হয়েছে আহরণের লক্ষ্যমাত্রা।

আগে যেখানে ৩৬ হাজার ৯২১ টন আহরণ করা হতো। বর্তমানে তা ৩৫ হাজার টন করা হয়েছে। যা আগের তুলনায় ১ হাজার ৯২১ টন কম আহরণ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সব মিলিয়ে আহরণযোগ্য মাছের পরিমাণ ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন।

সামুদ্রিক মৎস্য গবেষক ড. মোহাম্মদ শরিফুল আজম বলেন, 'আমাদের উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত ৪০ মিটার গভীরতায় মাছ ধরা হয়। যারা মাছ শিকার করেন তারা বেহুন্দি নামের এক ধরনের জাল ব্যবহার করেন, যে জালে সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে। আর ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। যে মাছগুলো প্রয়োজন, সেগুলো রেখে বাকিগুলো তারা সমুদ্রে ফেলে দেন। এতে করে আমাদের উপকূলীয় এলাকায় মাছের আঁধার কমে যাচ্ছে।

আর একটি দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তন, বেশি ঠান্ডা, বেশি গরম এমন পরিবেশে অনেক প্রজাতি রয়েছে, যেগুলোর সঠিক পরিবেশের অভাবে প্রজনন সমস্যা হচ্ছে। চলে যাচ্ছে অন্য জায়গায়, অন্য পরিবেশে। ফলে হুমকির মধ্যে রয়েছে অনেক প্রজাতির মাছ।'

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক খ. মাহবুবুল হক বলেন, 'বিশ্বে আহরিত সামুদ্রিক মাছের মাত্র ১ শতাংশ মাছ আমরা আহরণ করতে পারছি। এখন নতুন করে ভাবতে হবে, যে সব জায়গায় আমরা দীর্ঘদিন মাছ ধরছি তা এড়িয়ে চলতে হবে। আমাদের এখন নজর দিতে হবে গভীর সমুদ্রে। উপকূলীয় এলাকা থেকে গভীর সমুদ্রের দিকে যেতে হবে। আমাদের বোট ও জাহাজগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দামি মাছ আহরণ করতে হবে। তবেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন অপ্রতুল, কারণ অধিকাংশ সামুদ্রিক মৎস্য অগভীর সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকা থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে।

জাহাজের সক্ষমতা ও যথাযথ ফিশিং প্রযুক্তির অভাবে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা হয় না। বর্তমানে আমাদের মৎস্য আহরণ উপকূল থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরত্বে সীমাবদ্ধ।

বিকেপি/এমএইচএস 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন