Logo

জাতীয়

আগের ৩ নির্বাচনের সব কর্মকর্তা ‘অযোগ্য’, ভোটে দায়িত্ব পালন করবেন কারা?

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫, ২১:২৬

আগের ৩ নির্বাচনের সব কর্মকর্তা ‘অযোগ্য’, ভোটে দায়িত্ব পালন করবেন কারা?

বাংলাদেশে গত তিনটি নির্বাচনে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ বা ‘মিনিমাম ইনভলভমেন্ট’ যুক্ত কর্মকর্তাদের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দায়িত্বে রাখা হবে না— এমন ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এতে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় বেঁধেছে। প্রশ্ন উঠছে, তিন নির্বাচনের কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করলে আগামী নির্বাচনে কারা দায়িত্ব পালন করবেন? নাকি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠীকে সাইডলাইনে ফেলে আরেক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আমলাতন্ত্রে নতুন বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে?

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢালাওভাবে কর্মকর্তাদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ অনেককে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক করে তুলেছে। এর জের ধরে মাঠ প্রশাসনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কর্মকর্তাদের বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ‘সবচেয়ে বিতর্কিত বা পক্ষপাতমূলক কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া হবে। তবে তা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। নির্বাচনে অনেকেই দায়িত্ব পালন করেন, সবাইকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।’

সরকারও কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। তবে বিতর্ক এড়াতে অনেক কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্বে অংশ নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছেন— এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, ভোটে অনিয়ম এড়াতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়োগে নতুন কৌশল নেওয়া হবে। এ সংক্রান্ত প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগে বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু এলাকায় জেলা প্রশাসকদের পরিবর্তে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

বিতর্কের কেন্দ্রে ডিসি-এসপি
নির্বাচন কমিশন চলতি বছরের জুলাইয়ে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’য় সংশোধনী আনে। এতে সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কর্তৃত্ব থেকে ডিসি ও এসপিদের বাদ দেওয়া হয়।

গত তিন নির্বাচনে যারা রিটার্নিং অফিসার ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে চলতি বছরের শুরুতে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৪৫ জনকে ওএসডি করা হয়েছিল। এছাড়া সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যারা ২৫ বছর চাকরির বয়স পূর্ণ করেছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়; ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় ৪৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছিল।

বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো প্রধানত ডিসি-এসপিদের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ২৩ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে দলটির প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নির্বাচনে যুক্ত না করার দাবি জানায়।

কোন কর্মকর্তারা থাকবেন, বাছাইয়ের মানদণ্ড কী
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, গত তিন নির্বাচনে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ যুক্ত কেউ আগামী নির্বাচনে থাকতে পারবেন না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নির্বাচনে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হবে— শারীরিক সক্ষমতা, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এএসিআর), রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, কর্মদক্ষতা, পূর্ববর্তী পোস্টিং এবং সংবাদপত্রে রিপোর্ট।

উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জোর দেওয়া হয়, গত তিন নির্বাচনে ডিসি, এডিসি, ইউএনও বা যারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তাদের পদায়ন হবে না। এছাড়া রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার পদেও এই মানদণ্ড প্রযোজ্য।

ঢালাও অভিযোগ ও সতর্কীকরণ
সরকারের দিক থেকে ঢালাওভাবে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ যুক্ত কর্মকর্তাদের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইউএনও হিসেবে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন কিছু কর্মকর্তা দাবি করছেন, তারা সরকারি নির্দেশ ছাড়া কোনো অনিয়মে জড়িত হননি। তারা বলছেন, ‘ঢালাওভাবে অযোগ্য বলা হলে নিরীহ ও পেশাদার কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।’

সাবেক যুগ্ম সচিব বিজন কান্তি সরকার বলেন, ‘বিতর্কিত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা উচিত, তবে ঢালাওভাবে সব কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া ঠিক নয়। এরপর কাজ করবে কে?’ জন প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘নির্বাচনী দায়িত্বে অভিজ্ঞ ও পেশাদার কর্মকর্তারা বরাবর কম উৎসাহী। এই পরিস্থিতিতে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’র ক্রাইটেরিয়া স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’

নির্বাচনে দায়িত্ববণ্টন
তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২,৭৬১, ভোটকক্ষ ২,৪৬,৭৩৯। রিটার্নিং অফিসার সাধারণত জেলা প্রশাসক বা উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। কিছু ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারও রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকেন। তারা মনোনয়ন বাছাই, মনোনয়ন বাতিল, প্রার্থীর বৈধতা ও প্রতীক বরাদ্দ প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেন।

প্রিসাইডিং অফিসার সাধারণত সরকারি কলেজ, সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষক, ব্যাংকের ম্যানেজার বা সমমনা কর্মকর্তারা হন। প্রিসাইডিং অফিসারের অধীনে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ভোটকক্ষে দুইজন করে পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করেন। আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ সুপার দায়িত্বে থাকেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে তারা রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন।

এভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সরকারি কর্মকর্তারা। তবে বিতর্কিত বা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ এড়ানো, নতুন নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রেরণা ও দায়িত্বপালনের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের মনোযোগ রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি নিউজ বাংলা

এমএইচএস 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন নির্বাচন নির্বাচন কমিশন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন