প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৪১টি ও বৈধের বিরুদ্ধে একটি আপিল
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩৭
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল আবেদন শুরু হয়েছে। আপিলের প্রথম দিনে সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নির্ধারিত বুথগুলোতে বাছাইয়ে বাদ পড়া সম্ভাব্য প্রার্থীরা মোট ৪১টি এবং কুমিল্লা অঞ্চলের বৈধ প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটি আপিল আবেদন জমা দেন।
ইসির ১০টি নির্বাচনী অঞ্চলের মধ্যে রংপুর থেকে ৩টি, রাজশাহী ৫টি, খুলনা ৩টি, বরিশাল ১টি, ময়মনসিংহ ১টি, ঢাকা ১৫টি, ফরিদপুর ৭টি, সিলেট শূন্য, কুমিল্লা থেকে ৫টি (বাতিলের বিরুদ্ধে ৪টি ও বৈধের বিরুদ্ধে ১টি), চট্টগ্রাম থেকে ২টি আপিল আবেদন করা হয়েছে।
এদিন সকালে আপিল গ্রহণ কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি সবার সহযোগিতা থাকলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত নির্বাচন-পরিবেশ সন্তোষজনক।’
আপিলের প্রথম দিনেই বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা আবেদন করেছেন। এ সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মোট ভোটারের এক শতাংশ সমর্থন বাধ্যতামূলক করার বিধান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। পাশাপাশি মনোনয়ন দাখিল ও নির্বাচনী কার্যক্রমে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও তোলেন কয়েকজন প্রার্থী।
রাজবাড়ী-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা বলেন, ‘মোট ভোটারের এক শতাংশ সমর্থনের স্বাক্ষর দিতে না পারায় আমার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু কেন দিতে পারিনি, তা রিটার্নিং কর্মকর্তা অনুসন্ধান করেননি। আমার বাসার সামনে স্বাক্ষর সংগ্রহের সময় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নির্বাচন করতে বলা হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।’
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, ‘আমি দুই দিনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সংগ্রহ করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি, কিন্তু তা বাতিল করা হয়েছে। যারা আমার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন, তারা চান আমি নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। তাই আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
শরীয়তপুর-৩ আসনের জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল হান্নান বলেন, ‘পুরোনো একটি ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়ায় আমার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। মনোনয়ন জমার সময় জেলা নির্বাচন অফিস থেকে বলা হয়েছিল, এটি চলবে। পরে যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল করা হলো। ছোটখাটো ভুলের কারণে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া দুঃখজনক।’
নরসিংদী-৪ আসনের বাংলাদেশ কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রার্থী কাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মনোনয়ন জমা দিতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন আমার কাগজপত্র ছিনিয়ে নেন। পরে স্বাক্ষর নিয়ে আপত্তি তুলে আমার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। আমি আপিল করেছি, আশা করি প্রার্থিতা ফিরে পাব।’
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সমর্থিত প্রার্থী হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ‘হলফনামার আয়-ব্যয়ের একটি পৃষ্ঠা পূরণ না করায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। একই ত্রুটিতেও অন্য আসনে মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য আপিল করেছি।’
পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম ফজলুল হক বলেন, ‘এক শতাংশ সমর্থনের মধ্যে ২৯টি স্বাক্ষরে অসামঞ্জস্য দেখানো হয়েছে। রাজনৈতিক দল সমর্থিতদের ক্ষেত্রে এই শর্ত নেই, স্বতন্ত্রদের ক্ষেত্রে আছে— এতে বৈষম্য তৈরি হয়।’
বগুড়া-৬ আসনের বাসদ সমর্থিত প্রার্থী দিলরুবা বলেন, ‘আয়কর রিটার্নের কাগজ সত্যায়িত না হওয়ায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। পরে পূর্ণাঙ্গ কাগজ জমা দিয়েছি। সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।’
ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার বলেন, ‘এক শতাংশ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও যাচাইয়ের সময় কয়েকজনকে না পাওয়ার অজুহাতে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। আমি আপিল করেছি।’
এদিকে, আপিল কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘প্রার্থিতা বৈধ বা বাতিল— উভয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল দাখিল করা যাবে। ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।’
হলফনামা যাচাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী যাচাই করা হয়েছে। তবে কোনো তথ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আপিলের মাধ্যমে উত্থাপন করা যাবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ সমর্থনসহ যেকোনো কারণেই আপিল করা সম্ভব।’
নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমার কানে আসেনি। কোথাও অসঙ্গতি থাকলে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখবেন; আপিলে এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে— এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আপিল হবে। এ ক্ষেত্রে আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
উল্লেখ্য, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৩০০ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়ন দাখিল করেছেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়ন বৈধ এবং ৭২৩টি মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এসআইবি/এমবি

