Logo

জাতীয়

নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০

নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতমূলক’ আচরণের অভিযোগে তুলে ক্ষোভ দেখানো রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, কোনো ‘একটি পক্ষকে’ সন্তুষ্ট করতে অনেক রিটার্নিং অফিসার ‘একপেশে’ আচরণ করছেন। 

তারা বলছেন, ভিত্তিহীন বা ছোটখাটো ভুলে ‘বিশেষ প্রার্থীদের’ মনোনয়নপত্র বাদ দেওয়ার হিড়িক ও প্রার্থীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ চলতে থাকলে পাতানো নির্বাচনের তকমা পেতে পারে আসন্ন সংসদ নির্বাচন।

ইতোমধ্যে জামায়াত ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি ) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই অভিযোগ তুলেছেন। তারা এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কার্যকর পদক্ষেপ চান। জামায়াত ও এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিযোগ জানিয়েছেন। 

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘কোনো রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে এসে ৯ জানুয়ারি তারিখ পর্যন্ত আপিলের সুযোগ রয়েছে। ইসি তাদের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। ছোটখাটো সমস্যা থাকলে নির্বাচন কমিশন সাধারণত নমনীয় থাকে। ইসি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটখাটো কোনো বিষয়ে ভুলত্রুটির কারণে মনোনয়ন বাতিল করা আসলে গ্রহণযোগ্য নয়। 

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পেলে তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আসন্ন নির্বাচন কেমন হবে তা বলার সময় আসেনি।’

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি ছিল মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। এবার মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল মোট দুই হাজার ৫৬৮টি। এক হাজার ৮৪২টি বৈধতা পেয়েছে। সারা ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বাতিলের হার মোট প্রার্থীর ২৮ শতাংশ। 

সব দলের অংশগ্রহণে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাতিলের হার ছিল ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। নানা বিতর্ক থাকলেও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল। এ নির্বাচনেও বেশির ভাগ দল অংশ নিয়েছিল।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া বিএনপির ২৫ নেতার বেশির ভাগ এখন দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থী। তারা দলের মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত ১০, এনসিপির তিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯, জাতীয় পার্টির (জাপা) ৫৯, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ২৫ এবং স্বতন্ত্র ৩৩৮ জন প্রার্থীর মনোনয়পত্র বাতিল হয়েছে। অন্যান্য দলের কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির কক্সবাজার-২ আসনের প্রার্থী এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমার মনোনয়ন বাতিল হলে বিএনপির কেউ হাতে তালি দিতে পারেন কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা হাতে তালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। বিশেষ কোনো কারণ না থাকলেও বিএনপির প্রার্থীকে ডেকে নিয়ে এসে আমার বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ করানো হয়েছে। এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আলামত নয়।’

মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসির কাছে আপিল জমা দেওয়া প্রথমদিন গত সোমবার হামিদুর রহমান আযাদ ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারাসহ ৪২ জন আবেদন জমা দিয়েছেন। আগামী ৯ জানুয়ারি বিকাল ৫টা পর্যন্ত নেওয়া হবে আপিল আবেদন জমা দেওয়া যাবে। 

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জমান ফুয়াদ বলেন, ‘প্রশাসন ইতোমধ্যে একটি বড় দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তারা ধরেই নিয়েছে দলটি ক্ষমতায় চলে এসেছে।’

আর এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনের নামে প্রহসন করার কোনো মানে হয় না। এভাবে নির্বাচন না করে বিএনপি বলে দিতে পারে আমাদের এই কয়টি আসন দরকার।’

মনোনয়নপত্র বাতিলের পর বেশ কয়েকটি আসনে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই অভিযোগে এক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধতা পেলেও আরেক জনেরটা বাতিল হলে অভিযোগ উঠা স্বাভাবিক বলেও মনে করছেন প্রার্থীরা। 

দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কারণে সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিকের মনোনয়নপত্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেন্ডিং (স্থগিত) রাখা হলেও শেষদিনে তা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ একই ইস্যুতে সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায়। এই খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এই কারণে দলটির অপর প্রার্থী চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

নেত্রকোনা-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে একটি মামলার তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে।  

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও সম্পদের বিবরণী জমা না দেওয়ার অভিযোগে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। অথচ এই প্রার্থীর ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখার এক ঘণ্টা পরে তা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি নির্বাচনী হলফনামায় ঋণের তথ্য গোপন করলেও তার মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে বলেও গণমাধ্যমে খবরে বলা হয়েছে। এদিকে, রোববার মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাইয়ের সময় মানিকগঞ্জ জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে বিএনপির বহিস্কৃত নেতা ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমানের ওপর বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রিতার লোকজন হামলা করে।

তিনি লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আসন্ন নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেও ইসি ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ বাড়ছে প্রার্থীদের মাঝে। এ ছাড়া এখনো পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কার্যকর না থাকায় ভোটারদের মাঝেও নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর