Logo

জাতীয়

বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণ

‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা, গণভোটে সরকারের ভূমিকা প্রশ্ন তৈরি করছে?

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪২

‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা, গণভোটে সরকারের ভূমিকা প্রশ্ন তৈরি  করছে?

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পাশাপাশি গণভোটের ভোটগ্রহণও অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধান উপদেষ্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিন— এমন একটি ফটোকার্ড শেয়ার করার পাশাপাশি ভিডিওচিত্রের মাধ্যমেও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই ভিডিওচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং গুম কমিশনের সদস্যদের বক্তব্যের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোট কেন দেওয়া প্রয়োজন— তার ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।

একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে, তার বিস্তারিত তুলে ধরে ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না— এমন প্রচারণাও চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে।

যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে একটি নির্বাচন আয়োজন করা, সেখানে গণভোটে একটি নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচারণা চালানোয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে কি না— সেই বিতর্ক সামনে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিলেও নির্বাচন কমিশন কেবল গণভোটের বিষয়বস্তু এবং কীভাবে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট দেওয়া যাবে—সে সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে।

তবে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও), যারা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন, যদি এই প্রচারণায় যুক্ত হন, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাঁদের মতে, গণভোটে অবস্থান নেওয়ার প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে এবং আইন অনুযায়ী শাস্তির মুখে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এদিকে সরকারের এমন প্রচারণায় আইনি বাধা নেই বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করলেও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আপাতদৃষ্টিতে আইনি বাধা না থাকলেও অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনও ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে অন্তর্বর্তী সরকার কী করছে? 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি মূলত চারটি প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এসব প্রশ্নে ভোটারদের জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন এবং ভবিষ্যতে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা থাকবে কি না— সে বিষয়ে মতামত দিতে হবে।

এ ছাড়া জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ৩০টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়েও ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে।

এই সব প্রশ্নেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণার অংশ হিসেবে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

সরকার যে ১২টি বিষয় উল্লেখ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে— যে কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না, এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও পিএসসি গঠনে সরকারি ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পথ খুলবে। বিপরীতে ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না— এমন বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে।

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সব ব্যাংকে প্রচারণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় প্রতিটি ব্যাংক শাখায় দুটি করে ব্যানার টানানোর কথা বলা হয়েছে।

স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদেরও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাতে শিক্ষা বোর্ডগুলো নির্দেশ দিয়েছে।

এ ছাড়া জুমার খুতবায় আলোচনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন এবং পোশাক কারখানার সামনে ব্যানার প্রদর্শনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এক অনুষ্ঠানে বলেন, “আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দেশে আর কখনো রাতের ভোট হবে না।”

গত বছরের ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা জানান, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে।

এই প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদটি প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে।

সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।

সেদিন প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংবিধানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে।

গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালালেও বিএনপি জানিয়েছে, গণভোটের প্রচারণা চালানো তাদের দায়িত্ব নয়। দলটি সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

সোমবার ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “গণভোটের প্রচারণা চালানো বিএনপির দায়িত্ব না। জনগণই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।”

তিনি আরও বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি যে ৩১ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।

একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সংস্কারের পক্ষে। তাই আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।”

অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র ও তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য আসনভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে উদ্বেগ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পক্ষ নিয়ে প্রচারণার কারণে গণভোটে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় থাকছে না।

তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়াই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য, আর গণভোট সেই সংস্কারেরই অংশ।

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফিমা)-এর সাবেক সভাপতি মুনিরা খান বলেন, ‘সংস্কারের কারণেই নির্বাচন কিছুটা দেরিতে হচ্ছে। গণভোটে সরকার একটি পক্ষ হলেও তাতে জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না।’

তবে আইন বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, “নির্বাচনের সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই গণভোট ও নির্বাচন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

‘রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে’
নির্বাচন পর্যবেক্ষক আবদুল আলীম বলেন, গণভোটে সরকার নিজেই একটি পক্ষ। তবে ডিসি ও ইউএনওরা যদি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় যুক্ত হন, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।

তিনি বলেন, যেহেতু শিক্ষক ও ব্যাংক কর্মকর্তারাই সাধারণত প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের দিয়ে প্রচারণা চালানো হলে ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তার মতে, এসব কারণে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলাই অধিকতর নৈতিক ও গ্রহণযোগ্য হবে।

এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

গণভোট বিবিসি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর