৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার প্রকল্প বাতিল, ধারণকৃত ১৪৬৪০ ভিডিওর কী হবে?
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৭
গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণ দেখিয়ে ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া একটি সরকারি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিডিও সাক্ষাৎকার ধারণ করা হলেও সেগুলো বাতিল ঘোষণা করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এ কাজে যুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না এবং বাতিল হওয়া ভিডিওগুলো সংরক্ষণও করা হবে না।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) প্রথম আলোতে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যালোচনায় দেখা গেছে সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। ভিডিওতে নানা অসংগতি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এসব ভিডিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে— এই আশঙ্কায় ভিডিওগুলো বাতিল করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকার বাতিলের পাশাপাশি বিগত সরকার আমলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে নেওয়া ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ নামের প্রায় ৫০ কোটি টাকার পুরো প্রকল্পটিই বাতিল করা হয়েছে।
কী ছিল প্রকল্পে?
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ শীর্ষক প্রকল্পটি নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র, ৮০ হাজার ইউটিউব কনটেন্ট এবং ১৬টি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। তবে তার পাঁচ মাস আগেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভিডিও চিত্র নির্মাণের কাজ পায় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালের ১৬ মে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় ১৯টি নির্ধারিত প্রশ্ন অনুসরণ করার কথা ছিল। এর মধ্যে ছিল—কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কার নির্দেশে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাস কোথায় ও কীভাবে ছিলেন, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ এবং আহত হওয়ার তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয়।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, এমটিআই এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিও জমা দিয়েছে। এর মধ্যে বিগত সরকারের সময়ে ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিও জমা পড়ে, যা বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে পরে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ৬৪০টি বাতিল হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।
কেন বাতিল?
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাতিল হওয়া ভিডিওগুলোতে চুক্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত কাঠামো মানা হয়নি, আবার কোথাও ভিডিও ও শব্দের মানও গ্রহণযোগ্য ছিল না।
‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ প্রকল্পের পরিচালক আফরাজুর রহমান বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা মানেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভিডিও নির্মাণ বন্ধ করতে বলা হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা মানেনি। এ কারণেই বিল পরিশোধ করা হয়নি এবং প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির সভাপতি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বহু ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও ভিডিও ও অডিও মান নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি।
উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সভায় ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরও ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও জমা দিলে সেগুলো যাচাইয়ের জন্য একটি সাবকমিটি গঠন করা হয়। সাবকমিটি ভিডিওগুলো গ্রহণ না করার সুপারিশ করে।
সাবকমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার ইসলাম বলেন, ধারণকৃত ভিডিও চিত্র অত্যন্ত নিম্নমানের এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সঠিকভাবে উঠে আসেনি। এসব ভিডিও সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
আরেক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন বলেন, ভিডিওগুলোর বর্ণনা একঘেয়ে এবং সম্মুখযুদ্ধের অভিজ্ঞতা উঠে আসেনি। একই মত দেন কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা এফ আর চৌধুরী। তার মতে, ভিডিওগুলো প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাতিল হওয়া ভিডিওগুলোর ভবিষ্যৎ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এগুলো বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হবে না। কারণ, এসব ভিডিওতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হয়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপে বিগত সরকার আমলে জমা দেওয়া ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিওর বিপরীতে তিনটি বিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত জানার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত আরও ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও জমা দিয়ে এর বিপরীতে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বিল দাবি করে। এরপরই সাবকমিটি গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমটিআইয়ের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি বলেন, ভিডিও বাতিলের সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যমূলক। তার ভাষায়, ‘আমাদের আগের ১২ হাজার ৭৮৮টি সাক্ষাৎকার যদি মানসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে পরের ১৪ হাজার ৬৪০টি সাক্ষাৎকার খারাপ হয় কীভাবে? এটা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিহিংসামূলক কাজ।’
মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যে কথা বলছে, এটা তাদের মনগড়া। আগের মন্ত্রী (আ ক ম মোজাম্মেল হক) কাজ দেখেই ভিডিওচিত্র গ্রহণ করেছিলেন।’
সূত্র : প্রথম আলো
এমএইচএস

