তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫ জন নিহত : টিআইবি
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৬
ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, সরকার যদি ‘মব’ বা গণসহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মব সহিংসতার উৎস নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মব সহিংসতা শুরু হয়েছে খোদ সরকারের ভেতর থেকে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। সরকারের বাইরের শক্তি যারা এখন মব করছে, তারা সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরেই ক্ষমতায়িত হয়েছে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, সরকার শুরু থেকেই মব সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর তৎপরতা দেখাতে পারেনি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। বর্তমানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হেনস্থা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো একাধিক ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
টিআইবি আরও জানায়, থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নির্বাচনের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সহিংসতার ঝুঁকি শুধু নির্বাচনের দিন পর্যন্ত নয়, বরং নির্বাচনের পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে।
জুলাই-পরবর্তী জবাবদিহি প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে হত্যা মামলায় আসামি করা ও আটকের কড়া সমালোচনা করেন টিআইবি প্রধান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘পেশাগত অবস্থানের দায়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা কতটুকু বিচার আর কতটুকু প্রতিশোধ— সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।’ সরকারের প্রস্তাবিত দুটি মিডিয়া কমিশনকে ‘লোকদেখানো পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম সরকার কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে এবং বাইরের শক্তিকে সরকারই ‘অতিক্ষমতায়িত’ করেছে।
বিচারব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে এখনো পুরনো বিতর্কিত ধারাগুলো বহাল রয়েছে। বিচারক নিয়োগ কমিটি বা স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিচারব্যবস্থার ভেতরে ‘দলীয়করণ’ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন যে, রাজনীতিবিদ ও আমলারা জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নেননি। তারা কেবল নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে চান। একারণেই জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থার প্রতিটি সংস্কার পদ্ধতিতে তাদের আপত্তি ছিল। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অতীতের নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার এবার একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, যেখানে আর একটিও প্রাণহানি ঘটবে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গেলেও সংস্কারের প্রকৃত বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারের সদিচ্ছার ওপর।
এমএইচএস

