Logo

জাতীয়

ভোটের পর নতুন সরকারের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৩

ভোটের পর নতুন সরকারের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে সাথে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে যে ভোট পরবর্তী নতুন সরকারের জন্য কোন কোন বিষয়গুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করছে। যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল বিষয়’।

অবশ্য সংস্থাটি এটিও বলছে যে, নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণটা এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে প্রাথমিকভাবে সেটি প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও ভারতের সাথে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ সামলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেওয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

ক্রাইসিস গ্রুপের দিক থেকেও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলোর তালিকায় এসব ইস্যু ঠাঁই পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে দৃশ্যত মূল প্রতিযোগিতা হচ্ছে বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামীর জোটের মধ্যে এবং দুই জোটই ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করেছে।

যেসব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ

ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিনের একটি নিবন্ধ সোমবার প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সামগ্রিক চলমান ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

এ নিবন্ধেই তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সম্ভাব্য যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার একটি ধারণা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কয়েকটি কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এ ভোট বাংলাদেশকে শুধু সাংবিধানিক কাঠামোতেই ফেরাবে না, বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো সত্যিকার জনরায়ের ভিত্তিতে একটি সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।

‘দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ধীরগতির অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনকে মোকাবেলা করতে হবে। তাকে সামলাতে হবে ভারতের সাথে সম্পর্কের ইস্যুসহ যুক্তরাষ্ট্র চীন প্রতিযোগিতার প্রভাব ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জটিল পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক,’ ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

টোমাস কিন লিখেছেন, হাসিনার পতনের পর হিযবুত-তাহরিরের মতো উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এদের মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আছে।

তার মতে, নির্বাচনের পরে নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল ইস্যুও মোকাবেলা করতে হবে, কারণ ইতিহাস ও শক্ত ভোট ভিত্তির কারণে আওয়ামী লীগকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব নয়।

‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দলের কর্মকাণ্ডের কারণে নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও আওয়ামী লীগকে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আওয়ামী লীগের কোনোভাবে প্রত্যাবর্তনের শর্ত নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে।’

টোমাস কিন লিখেছেন, তিনি মনে করেন এটি করতে হলে আওয়ামী লীগকে আগে সহিংসতার জন্য অনুশোচনা করতে হবে, যা করতে শেখ হাসিনা এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।

তবে এক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছাতে ভারত ও অন্য বিদেশি প্রভাবশালী সরকারগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, দেশের তরুণদের আশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি আসতে পারে।

এগুলোই প্রধান চ্যালেঞ্জ?

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন প্রশাসনের সামনে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরোনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতাটা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

‘কর্তৃত্ববাদ পরবর্তী সময়ে মবসহ আইন শৃঙ্খলার যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেই বিবেচনায় আইন শৃঙ্খলা ঠিক করা এবং রাষ্ট্র ও সরকার যে সেটি করতে সক্ষম সেই আস্থা জনমনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ তাদের থাকবে,’ বলেন তিনি।

ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধেও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার প্রায় অগ্রগতি পায়নি এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরেনি।

এছাড়া পুলিশের দুর্বল অবস্থানের কারণে মব সন্ত্রাস, বিশেষ করে দল বেঁধে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বেড়েছে। র‌্যাব, ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থাগুলোতে সংস্কার হয়নি বলে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশটির অন্তত তিনটি মানবাধিকার সংগঠন ২০২৫ সালের অর্থাৎ গত এক বছরের যে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, মব ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাস বছর জুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

এসব সংগঠন বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও মবের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। ঢাকায় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাতেও সরকারের দিক থেকে কার্যকর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোনো চেইন অব কমান্ড নেই।

‘এ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তিটাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন জায়গায় কিছু ব্যক্তি দানব হয়ে ওঠেছে এবং তারা যা খুশী করছে। দেখার বিষয় হবে পরবর্তী সরকার কীভাবে এটি মোকাবেলা করে,’ বলেন মজিবুর রহমান।

এবার সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোটও হবে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে। ফলে নির্বাচনে যারাই জিতবেন তারা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, সংসদে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনা- এ তিন ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে অতীতের সরকার ও রাজনীতির যে সংস্কৃতি সেটির পরিবর্তে জনপ্রত্যাশা পূরণে কতটা ভিন্নতা তারা দেখাতে পারেন সেটিও নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তবে ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতার যে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন সরকারকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আওয়ামী লীগের নিজের পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে।

ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকায় আসা এবং পরে ভারতের লোকসভায় মিসেস জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে – ভারত সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহের একটি ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন অনেকে।

‘আওয়ামী লীগের ইস্যুটি দলটির নিজের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। পাশাপাশি বড় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে,’ বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাবশালী কিছু দেশ যেভাবে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে নতুন সরকারকে সেটিও সামলাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘স্থবির ব্যবসা বাণিজ্যকে সচল করা এবং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারকে নিতে হবে।’ তথ্যসূত্র-বিবিসি 

এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর