Logo

জাতীয়

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

Icon

বাংলাদেশের প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৫

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি গুরুতর উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির দাবি, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, মব ভায়োলেন্স এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তার ভাষায়, ‘মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে হামলা হয়েছে। এতে নাগরিক নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এই সময়ে কিছু অদৃশ্য শক্তির তৎপরতা লক্ষ করা গেছে, যার ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শ ও সক্রিয়তা অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে জনমনে হতাশা বেড়েছে।

রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি; দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।

এই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। ৩০০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয়সহ ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর— এই তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হন। উল্লেখযোগ্য ঘটনায় পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকাতেও মনোনয়ন বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

মব ভায়োলেন্স ও সাংবাদিক নির্যাতন

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ মাসে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলায় ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় ৪১টি মামলায় ৬৯ জনকে অভিযুক্ত এবং ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টকে কেন্দ্র করে এসব মামলা হওয়ায় আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হন। একই সময়ে কারাগারে ১২৭ জন আসামির মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ কয়েকজনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিবারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হন। এ ছাড়া ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা ও ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

মাজার, সীমান্ত হত্যা ও সামাজিক সহিংসতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, সারাদেশে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। সীমান্তে ১১০টি ঘটনায় ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হামলায় নিহত হন আরও ৩ জন।

একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১ হাজার ১৬ জন এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৪৭৮ জন। শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্ঘটনায়ও শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন।

এইচআরএসএস জানায়, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

এসএসকে/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

অন্তর্বর্তী সরকার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর