নির্বাচন না হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:১৪
ছবি: সংগৃহীত
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, নির্বাচন না হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। সরকার আশা করছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও এ বিষয়ে এখনো অনেকে সন্দিহান। তবে তাঁর মতে, নির্বাচন না হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।
বৃহস্পতিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে শেষ মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
তৌহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচন কখনোই পুরোপুরি পারফেক্ট হয় না। বাস্তবে পারফেক্ট নির্বাচন হওয়া খুবই বিরল। জীবনের কোনো কিছুই নিখুঁত নয়, কিছু না কিছু সমস্যা থাকেই। তবে মূল বিষয় হলো, নির্বাচন জনমতের প্রতিনিধিত্ব করছে কি না। জনমত বোঝার জন্য শুধু সংখ্যার দিকে তাকাতে হয় না; অনেক সময় সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখেই তা বোঝা যায়। তিনি বলেন, অতীতে যে চারটি নির্বাচন হয়েছে, যেগুলোকে নির্বাচন বলা যায়, সেগুলোতে জনমতের প্রতিফলন ছিল।
ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন সেখানে ছিলেন। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত দেশটিতেও পারফেক্ট নির্বাচন হয় না; সেখানেও সমস্যা থাকে।
আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের কোনো চাপ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা কিছু কূটনীতিক আওয়ামী লীগের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তবে সবাই নয়। কেউই কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করেননি। কেউ বলেননি কী করা উচিত বা উচিত নয়। তিনি জানান, যাঁরা জানতে চেয়েছেন, তাঁদের তিনি বলেছেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, নানা কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ ছিল না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সরকারের উত্তরসূরি হয়ে যে নতুন সরকার আসবে, তারা এই অচলাবস্থা কাটিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারবে।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে ভালো কাজের সম্পর্ক চাওয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থানে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দায়দায়িত্বের জায়গা থেকে ভারত–বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সরকার বরাবরই আগ্রহী ছিল।
সম্পর্ক প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একে পুরোপুরি সফল বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক থমকে ছিল। তবে তিনি মনে করেন না যে বড় কোনো সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বরং সম্পর্ক কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল।
তৌহিদ হোসেন বলেন, তিনি কাউকে দোষারোপ করতে চান না। ভারত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থের ধারণা মেলেনি, ফলে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকারের সময়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তাঁর ভাষায়, ইস্যু থাকবেই, স্বার্থের সংঘাতও থাকবে। তবে সত্ত্বেও একটি মসৃণ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেন, তাঁদের সময়ে সম্পর্ক খুব একটা স্মুথ ছিল না এবং কয়েকটি বড় ধরনের পিছুটান হয়েছে।
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রেখে দুই দেশের সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, নৈরাশ্যবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। আশাবাদী হতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, এ সমস্যার সমাধানে কোনো না কোনো পথ বের হবে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের মনোভাব জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনোভাব একটি বিমূর্ত বিষয়। আনুষ্ঠানিকভাবে যা হয়েছে, সেটুকুই বলা যায়। বাংলাদেশ তাকে ফেরত চেয়েছে, তবে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর বাইরে অনুমানের ভিত্তিতে কিছু বলা ঠিক হবে না।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য চুক্তি পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা হয়ে গেল কি না—এ প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এগুলো বোঝা নয়; বরং অনেক বিষয় এগিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে পরবর্তী সরকারের কাজ সহজ হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দরকষাকষির মাধ্যমে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা সম্ভব হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারের জন্য সুবিধা তৈরি করবে।
জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি হঠাৎ করে হয়নি। এর প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই চলছিল এবং গত দেড় বছর ধরে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা না পাওয়া নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ দায় এককভাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়। এটি দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার দায়। পৃথিবীতে অনেক সুযোগ রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশিরা নিজেদের দোষেই সেগুলো কাজে লাগাতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ভিসা না পাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ দায় আমাদেরই। জালিয়াতির কারণে কাগজপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে। কাগজের ওপরই ভিসা ও ভর্তির মতো বিষয় নির্ভর করে। যদি কাগজ বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে সমস্যা হবেই।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কেউ গৃহকর্মীর কাজে বিদেশে গেলেও তার ভিসায় পদ লেখা থাকে ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজার। এতে স্পষ্ট হয়, কী পরিমাণ জালিয়াতি করা হচ্ছে। যত দিন পর্যন্ত ঘরের ভেতরের এই সমস্যা সমাধান না করা যাবে, তত দিন পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। বরং আরও দুঃসময় আসতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এএস/

