‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’- কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পঙ্ক্তি। আধুনিক কোনো কবি বলতে পারেন- মনে নিরানন্দ, তাতে কী? আজ বসন্ত, পহেলা ফাল্গুন। সুখের বিষয় বসন্ত শুরু ও ভালোবাসার দিন একাকার হয়ে গেছে। তাই আজ শুধুই ভালোবাসার দিন। হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন’স ডে। এবারো ফুল ফুটেছে। দখিন হাওয়ার গুঞ্জরণও লেগেছে। ফাগুন হাওয়ার দোল লেগেছে বাংলার নিসর্গ প্রকৃতিতে। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠছে সবুজ অঙ্গন। মাঘের শেষ দিক থেকেই গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। শীতের খোলসে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম এখন অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠেছে। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ জানিয়ে দিচ্ছে বসন্ত এসেছে এবং সত্যি সত্যি ঋতুর রাজা।
‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল/ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ফাল্গুন কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুনের মানসপটে বারবার হানা দিচ্ছে কবিগুরুর এ ‘ফাল্গুন’। ঋতুরাজ বসন্ত আবাহনের ক্ষণযাত্রা। ফুলেল মধুময় ও যৌবনের উদ্দামতা বয়ে আনার বসন্ত, উচ্ছ্বাস ও উদ্বেলতায় মন-প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বসন্ত। স্বাগত বসন্ত। প্রাণ খুলে তাই যেন কবির ভাষায় বলা যায়, ‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে/এত বাঁশি বাজে/এত পাখি গায়।’ কোকিলের কুহুতান, দখিনা হাওয়া, ঝরাপাতার শুকনো নূপুরের নিক্বণ, প্রকৃতির মিলন এ বসন্তেই। বসন্ত মানেই যে পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা।
শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিময় বাতাস জানান দেয় নতুন লগ্নের। ফাল্গুনের আগমনে পলাশ, শিমুলে আগুনের খেলা। মধুর বসন্তের সাজ সাজ রব সর্বত্র।
এমন ফাল্গুনেই, বায়ান্নর আট ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনে তারুণ্যের শব্দ বিপ্লব, সাহসী উচ্ছ্বাস ও বাঁধভাঙা আবেগে বাংলা একাকার হয়েছিল। বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি অনাদিকাল থেকেই। কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে নানা অনুপ্রাস, উপমা ও উৎপ্রেক্ষায়।
গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, গাছ, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তের রঙে রঙিন। চোখ বুজলেও টের পাওয়া যায় এমন দৃশ্যপট। নাগরিক ইট-পাথরের জীবনে বসন্ত এসেছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ হয়ে।
এমন ক্ষণে এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলার কথা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এবার মেলা পিছিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে। ফাল্গুনের প্রথম দিনে বইমেলা চলমান থাকলে তা ভিন্ন আবহ পেত।
বাসন্তী আজকের দিনে রমণীরা রাঙিয়ে তুলবে রাজপথ, পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশোভিত সবুজ চত্বরসহ পুরো নগরী। কংক্রিটের নগরীতে কোকিলের কুহুস্বর ধ্বনিত হবে ফাগুনের আগমনে।
একইসঙ্গে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবস। শুধুই ভালোবাসার দিন। ফাগুনের প্রথম প্রহরে আজ উদযাপিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবস। প্রতিবারের মতো এবারো দিবসটিকে ঘিরে মনে মনে লেগেছে আনন্দের ঢেউ।
ভ্যালেন্টাইন’স ডে-র পাশ্চাত্য প্রভাব নিয়ে নাক সিঁটকানো মানুষরাও আজকের দিনে বেশ উদার। অবশ্য ভালোবাসা দিবসের সময়টা এখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই দিবসটা এমন সময়ে পালিত হয় যখন বাংলাদেশে বসন্ত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে।
যতদূর জানা যায়, ১৯৯৩ সালের দিকে আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে। দিবসটি প্রচলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান। তার সাহচর্যেই ভালোবাসা দিবস আজকের রূপে।
ইতিহাসে আধ্যাত্মিক বা রহস্যময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে জানা গেছে, তাদের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ার সাধক ভ্যালেন্টাইন (১০০-১৫০) ইতিহাসে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন রহস্যময় শিক্ষক ও ১৪৩ সালে ‘বিশপ অব রোম’ পদের একজন শক্তিশালী প্রার্থী। তার ভালোবাসার রূপে বিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে। খ্রিস্টধর্মের মৌল চেতনায় কঠোর তপস্যা ও কৌমার্যব্রত পালনকে তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। পরকালে দায়মুক্তির কনসেপ্টের চেয়ে বাসরঘরই তার কাছে শ্রেয় ছিল।
জার্মান পণ্ডিত গুয়েবার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের দেবতা ভ্যালি সম্পর্কে লিখেন- ‘ভ্যালি হচ্ছেন চিরন্তন আলোর উৎস’। যেমন করে ডিভার হচ্ছে, এমন বস্তু যাকে কোনো দিনও ধ্বংস করা যাবে না। আলোক রশ্মিকে যেমন তীর হিসেবে বর্ণনা করা, তেমনই দেবতা ভ্যালিও সব সময় তীরের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। এ কারণে নরওয়েবাসী ফেব্রুয়ারি মাসের ক্যালেন্ডারটিতে ধনুকের চিহ্ন রাখবেই। আর এটির নাম ‘লিয়া-বেরি’- মানে আলো আনয়নকারী। এক সময় জার্মানির খ্রিস্টানরা ফেব্রুয়ারি মাসটিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জন্য উৎসর্গ করে দেশের উপজাতিদের ধর্মীয় আচার পালন থেকে বিরত থাকতে বারণ করতো। বলা হয়ে থাকে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন দেবতা ভ্যালির মতোই দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন।
ইতিহাসে রয়েছে- ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ভালোবাসা ও উর্বরতার সম্পৃক্ততার প্রমাণটিও নাকি বেশ প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিক ক্যালেন্ডারে মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টির নাম হয়েছে থ্যামিলিয়ন। আর প্রাচীন রোমে ১৫ ফেব্রুয়ারিকে বলা হতো লিউপারক্যালিয়া। পোপ গ্যালাসিয়াস (৪৯২-৪৯৩) লিউপারক্যালিয়া উৎসব বাতিল ঘোষণা করেন। তবে পোপ ৪৯৬ সালে ঘোষণা দেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালিত হবে। সেই থেকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে। অর্থাৎ ভালোবাসা দিবসের শুরু।
জানা যায়, তিনজন খ্রিস্টান শহীদ ভ্যালেন্টাইনের নামে দিবসটি পালন শুরু হয়। তবে তাদের মধ্যে কে প্রকৃত ভ্যালেন্টাইন ছিলেন এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। রয়েছে নানামাত্রার আখ্যান। রয়েছে নানাজনের নানামত। তবে গল্প কিংবা বিতর্ক যাই থাকুক, ভ্যালেন্টাইন’স ডে এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গোত্র বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গোটা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে তার আবাহন। যার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে ভালোবাসার সবুজবার্তা।
অন্তত এই একটি দিনেও যদি মানুষের মধ্যে শান্তি ও সদ্ভাব ফিরে আসে, তাহলে মন্দ কী? কারণ আমরা চাই, সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে মৈত্রী ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হোক পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ। রচিত হোক মহামিলনের মহাকাব্য। ভালো থাকুক ভালোবাসা। ভালোই থাকে ভালোবাসা।
বিকেপি/এমএইচএস

