মন্তব্য প্রতিবেদন
গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার ও সাংবিধানিক সীমা
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৬
ছবি : কালের কণ্ঠ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, তখন বিষয়টি আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক শালীনতার প্রশ্নে রূপ নেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন মহলের চাপ ও অন্যায়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করায় নতুন করে এই বিতর্ক সামনে এসেছে- রাষ্ট্রপতি কি এভাবে সাক্ষাৎকার দিতে পারেন? ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ ধরনের বক্তব্য কোনো পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য কি না? আইন ও সংবিধান এ বিষয়ে কী বলে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। এটি আইন, রীতি, সাংবিধানিক নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্মিলিত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
দেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও তিনি কার্যত নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নন। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন, নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র নন; বরং তিনি রাষ্ট্রের ঐক্য, ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক। এই অবস্থান থেকেই রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ও প্রকাশ্য মতামতের ক্ষেত্রে এক ধরনের আত্মসংযম প্রত্যাশিত।
বাংলাদেশের সংবিধান বা কোনো প্রচলিত আইনে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার দেওয়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়। সংবিধানে এমন কোনো বিধান নেই, যা রাষ্ট্রপতিকে গণমাধ্যমে কথা বলা বা সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে বিরত রাখে। ফলে কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার দেওয়া বেআইনি নয়। কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। কারণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেবল ‘আইনগত অনুমতি’ যথেষ্ট নয়; দেখতে হয় ‘সাংবিধানিক রীতি’ ও ‘রাষ্ট্রীয় শালীনতা’। রাষ্ট্রপতি যদি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, চাপের মুখে পড়ার কথা বা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সরকার ও মহলের অন্যায় আচরণের অভিযোগ প্রকাশ করেন, তাহলে তা কয়েকটি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়- রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় কি না? রাষ্ট্রপতির পদ দলনিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য। রাজনৈতিক চাপ বা অন্যায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে যদি পরোক্ষভাবে কোনো পক্ষ বা সময়কালকে অভিযুক্ত করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চলমান বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কে প্রভাব পড়ে কি না?
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য সাধারণ নাগরিকের বক্তব্যের মতো নয়। তা রাজনৈতিক বিতর্কে ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে- যা সংবিধানের ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেসব তথ্য ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তার সবই ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। অনেক তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতায় পড়ে, যা প্রকাশ করা সাংবিধানিকভাবে অনুচিত- বাবহ রভ হড়ঃ বীঢ়ষরপরঃষু রষষবমধষ। সাক্ষাৎকারে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চাপ ও অন্যায়ের প্রসঙ্গ তোলা বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত ও সাংবিধানিকভাবে জটিল অধ্যায়।
এই সময়কাল নিয়ে রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্য মন্তব্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যাখ্যার অংশ হয়ে উঠতে পারে। এতে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইতিহাসের দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে-যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত সতর্কতার দাবি রাখে।
এ ধরনের সাক্ষাৎকার কি বাংলাদেশের কোনো পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য? এর জবাবে আইনগত দিক থেকে বলতে গেলে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃত। যদি রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ, মানহানি বা গোপনীয়তা ভঙ্গের উপাদান না থাকে, তাহলে তা প্রকাশে সরাসরি আইনি বাধা নেই।
কিন্তু এখানেও আসে সম্পাদনাগত দায়িত্ব। একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রকে দেখতে হয়- বক্তব্যটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে কি না। এটি কোনো পক্ষকে অযথা সুবিধা বা ক্ষতি করছে কিনা। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান ও নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না। আইন অনুমতি দিলেও নৈতিকতা সব সময় অনুমোদন দেয় না- এ কথা গণমাধ্যমকেও মনে রাখতে হয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোতে রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানরা সাধারণত ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক বা বিতর্কিত বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী বা সাক্ষাৎকারে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এই রীতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখে এবং ক্ষমতাসীন অবস্থায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশের ফলে যে জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা এড়াতে সহায়ক হয়।
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি ‘আইন অনুমতি দেয় কি না’র চেয়ে ‘সংবিধানের আত্মা কী চায়’।
আইনি ন্যূনতমতা বলে, রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকার দিতে পারেন। কিন্তু সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে, রাষ্ট্রপতির উচিত এমন আচরণ এড়িয়ে চলা, যা তাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ নয়- এটি সত্য। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, চাপ ও অন্যায়ের বর্ণনা প্রকাশ করা সাংবিধানিক রীতি ও রাষ্ট্রীয় শালীনতার প্রশ্নে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করে- এটিও সমান সত্য। রাষ্ট্রপতি কোনো সাধারণ নাগরিক নন; তিনি রাষ্ট্রের প্রতীক। তার কণ্ঠ ব্যক্তিগত হলেও প্রতিধ্বনি পড়ে রাষ্ট্রীয় পরিসরে। তাই এ ধরনের সাক্ষাৎকার প্রকাশের আগে রাষ্ট্রপতির আত্মসংযম যেমন জরুরি, তেমনি গণমাধ্যমের সম্পাদনাগত দায়িত্বও অনস্বীকার্য।
গণতন্ত্র শুধু আইনের শাসনেই টিকে থাকে না; টিকে থাকে নৈতিক সংযম, সাংবিধানিক সৌজন্য ও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সত্য আরও বেশি।
বিকেপি/এমএইচএস

