নানা প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। নতুন এই সংসদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্র সংস্কারসহ রয়েছে নানা সংশয়ও।
বিশেষ করে দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন- এসব বিষয় নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে গতকাল বুধবার সরকারি দল ও বিরোধী দল পৃথকভাবে সংসদীয় দলের বৈঠক করেছে। সরকারি দলের বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে বিরোধী দল জানিয়েছে, ‘জুলাই সনদ’ পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগে সরকার পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকারের নাম প্রস্তাব করা হলেও তারা তা গ্রহণ করবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে কি না- এটাই এখন বড় প্রশ্ন। অতীতে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে একটি কার্যকর সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা নতুন সংসদের জন্য বড় পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সংসদ কার্যকর না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। বিগত কয়েকটি সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা না থাকা এবং সংসদীয় কমিটির সীমিত কার্যকারিতার কারণে সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এবার সরকার ও বিরোধী দল সক্রিয় ভূমিকা রাখলে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যথায় আবারও পুরনো ধারা ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা আশাবাদী। তার মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার শুরু থেকেই পরিবর্তনের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সংস্কার প্রশ্নে সরকার অনীহা দেখালে বিরোধী দল সংসদে যেমন সক্রিয় থাকবে, তেমনি প্রয়োজনে রাজপথেও আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঘটনায়। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, যা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। প্রায় দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে অতীতের সব নির্বাচনী রেকর্ড ভেঙে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে।
ফলে সংসদে নীতিনির্ধারণী বিতর্ক, প্রশ্নোত্তর এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন একটি পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর এবারের সংসদ এককভাবে কোনো দলের ‘অনুগত সংসদ’ হবে না বলেও অনেকের ধারণা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশই নতুন মুখ। প্রায় ৭৬ শতাংশ সদস্য প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাও নতুন সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তরুণ ও প্রথমবার নির্বাচিত অনেক সদস্য সংসদে এসেছেন, যাদের একটি অংশ ছাত্ররাজনীতি, নাগরিক আন্দোলন বা পেশাজীবী সমাজ থেকে উঠে এসেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় তারা দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনের বাস্তবতায় এসব প্রত্যাশা বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে সংসদের শুরুতেই কয়েকটি রাজনৈতিক ইস্যু সামনে এসেছে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ প্রশ্ন এবং নির্বাচন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ সংসদে উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও বিরোধী দলের আপত্তি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইস্যু সংসদের শুরুতেই সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করতে পারে। যদি এসব প্রশ্ন সংসদীয় বিতর্কের মধ্য দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তবে সংসদ কার্যকর হতে পারে। অন্যথায় তা রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিলে সংসদের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও সূচনা। জনগণের প্রত্যাশা- সংসদ হবে কার্যকর বিতর্কের জায়গা, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির একটি শক্তিশালী মঞ্চ। এখন দেখার বিষয়, নতুন বাস্তবতায় গঠিত এই সংসদ সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না।
যা যা হবে: এটি ২০২৬ সালেরও প্রথম অধিবেশন। রাষ্ট্রপতি মো. গাহাবুদ্দিন বেলা ১১টায় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে এবং পরে সংসদ সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করবেন। সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপতি প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন।
প্রথম বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে নতুন সংসদের কার্যক্রম। প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলো অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। এ ছাড়া প্রয়াত সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সভাপতিত্ব করবেন সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য।
দায়িত্ব গ্রহণের পর অধিবেশন পরিচালনা করবেন নতুন স্পিকার। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, প্রথম অধিবেশন চলবে প্রায় এক মাস।
জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ উপনেতা কে হবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদ নেতা তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
এদিকে, গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করেন।
অধিবেশন শুরুর আগে সংসদের কার্যপ্রণালী নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে অধিবেশনের সময়কাল ও এজেন্ডা নির্ধারণ করা হবে।
প্রথম বৈঠকে সরকারি দলের (ট্রেজারি বেঞ্চ) প্রধান কাজ হবে সরকার যে সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চায় সেগুলো সংসদের সামনে উপস্থাপন করা।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদকালে মোট ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি বা সংশোধন করেছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। ১৩তম জাতীয় সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। আর বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় প্রথম অধিবেশনে একজন জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা সভাপতিত্ব করবেন বলে সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সংসদের প্রথম বৈঠক শুরু হওয়ার পরপরই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের শপথ পাঠ করাবেন। তাদের নির্বাচনের পর শপথগ্রহণের জন্য অধিবেশন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হতে পারে। এরপর নবনির্বাচিত স্পিকার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।
প্রথম বৈঠকেই নতুন সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে, যার প্রধান থাকবেন নতুন স্পিকার। এই কমিটিই উদ্বোধনী অধিবেশনের মেয়াদ এবং সংসদের অন্যান্য কার্যসূচি নির্ধারণ করবেন।
এ অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা হতে পারে। প্রথম বৈঠকে সংসদে শোক প্রস্তাবও গৃহীত হবে।
বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ বসাতে চাইছে বিএনপি। স্পিকার পদে দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য আবদুল মঈন খান, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদের ব্যাপারে আলোচনা বেশি।
জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, আইনসভা হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের ভোটের সংখ্যা অনুপাতে। উভয় কক্ষে বিরোধী দল থেকে একজন করে ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি একমত হলেও উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতি নিয়ে তাদের ভিন্নমত রয়েছে। তবে দলটি ইতিমধ্যে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিকেপি/এমবি

