পবিত্র ঈদুল ফিতর, স্বাধীনতা দিবস এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে দীর্ঘ অবকাশ শেষে প্রিয়জনদের ছেড়ে আবারও যান্ত্রিক নগরী ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। শনিবার ভোর থেকেই দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। তবে স্বস্তির ঈদযাত্রা শেষে ফেরার এই পথে যাত্রীদের সঙ্গী হয়েছে তীব্র যানজট, স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং পরিবহণগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সীমাহীন ভোগান্তি।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বরিশাল নদীবন্দর
ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শনিবার ছিল মানুষের উপচে পড়া ঢল। বরিশাল থেকে আসা ১৪টি বিলাসবহুল
লঞ্চের প্রতিটিই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। কেবিনগুলো ১০ দিন আগেই বুক হয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা
ডেকের ওপর, এমনকি লঞ্চের ছাদেও জায়গা করে নিয়েছেন। এম খান-৭ লঞ্চের যাত্রী সোবাহান
মিঞা বলেন, “বাস না পেয়ে লঞ্চে এসেছি, কিন্তু এখানেও তিল ধারণের
জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে ছাদে চাদর বিছিয়ে বসেছি।” বিআইডব্লিউটিএ এবং পুলিশ প্রশাসন কড়া
নজরদারির দাবি করলেও অনেক লঞ্চকেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাট ছাড়তে দেখা
গেছে।
রেলপথেও চিত্রটি ছিল ভয়াবহ। উত্তরবঙ্গ
ও খুলনাঞ্চল থেকে আসা প্রতিটি ট্রেনই ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল
দিতে না পেরে শত শত মানুষকে ট্রেনের ছাদে ও ইঞ্জিনে বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরতে
দেখা গেছে। কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে পা রাখার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। রাজবাড়ীর
কালুখালী স্টেশনে ঢাকামুখী ‘নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস’-এ আসন না পেয়ে
কয়েকশ যাত্রী ছাদে উঠে পড়েন। রাজশাহী থেকে আসা আদুরি আক্তার বলেন, “পরিবারের সঙ্গে
ঈদ শেষে সময়মতো পৌঁছাতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু স্টেশনে নেমেই সিএনজি ও রিকশাওয়ালাদের
দ্বিগুণ ভাড়ার খপ্পরে পড়তে হচ্ছে।” স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন জানান,
অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেনগুলো কিছুটা ধীরগতিতে
চালানো হচ্ছে।
সড়কপথে গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস
টার্মিনালে সারাদিনই ছিল ফিরতি মানুষের ব্যস্ততা। গাবতলীতে আমিন বাজার ব্রিজ থেকে মাজার
রোড পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন,
ফেরার সময় বাসগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করা
হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা শিক্ষক মোজাম্মেল হক জানান, যাওয়ার সময় ভাড়া স্বাভাবিক থাকলেও
ফেরার সময় চুয়াডাঙ্গা থেকে তাকে চড়া দামে টিকিট কাটতে হয়েছে। মহাখালী টার্মিনালে আসা
যাত্রীরা জানান, রোববার সব অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে, তাই শনিবার যাত্রীদের চাপ
কয়েকগুণ বাড়বে।
এবারের ঈদযাত্রায় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস
ডুবিসহ বেশ কিছু দুর্ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি যাত্রীদের মন থেকে। অনেকে বাসে যাতায়াতে
ভয় পেয়ে ট্রেন বা লঞ্চকে বেছে নিচ্ছেন। ফেরার পথেও যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে,
সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাইওয়ে পুলিশকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন সাধারণ
যাত্রীরা।
বিআইডব্লিউটিএ এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে,
ফিরতি যাত্রীদের চাপ সামলাতে বিশেষ ট্রেন ও লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বরিশাল মেট্রোপলিটন
পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “যাত্রীদের নিরাপত্তা
ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নদীবন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কোনো লঞ্চ যাতে
ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী না নেয়, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।”

