Logo

জাতীয়

ঈদ যাত্রায় মৃত্যুর মিছিল

Icon

শেখ শফিকুল বারী

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ২১:২১

ঈদ যাত্রায় মৃত্যুর মিছিল

ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল ফিতরের বন্ধে অর্থাৎ ঈদ যাত্রা ও ফেরায় সারা দেশে সড়ক, নৌ ও রেল পথে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ মার্চ পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা হয়। 

এবার ঈদে বাড়ি যাওয়া ও ফিরে আসার সময় গত ১৫ দিনে সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌ পথে সব মিলেয়ে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ হাজার ১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন। গতকাল সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদবে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারে ঈদ যাত্রা ও ফেরায় যেন মৃত্যুর মিছিল ছোটে। 

অনেকের মতে, যানবাহনের চালাকদের বেপরোয়া দ্রুত গতি, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেনতা এবং সড়কে বিশৃঙ্খল ভাবে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল দুর্ঘটনার মূল করণ। সর্বোপরি সড়ক পরিবহণে সামগ্রিক অব্যাবস্থাপনাকে দায়ি করেছেন তারা। 

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন। বিগত বছরের তুলনায় এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, আহত ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়েছে। 

অপরদিকে যাত্রী ও সড়ক নৌ ও রেল পথ নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত  ১৭ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৮দিনেই ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ৬ হয়েছে শতাধিক। 

দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবারের ঈদের পরদিন সর্বাধিক সংখ্যক ২৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঈদের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ১০ জন। নিহতদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সের নারী-পুরুষ রয়েছেন। নিহতদের একটি বড় অংশ মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন, যাদেও অধিকাংশই ছিল কিশোর-যুবক। বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত, ১১৪ জন আহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ, নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রায়।

এরমধ্যে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় সর্বাধিক ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ৬ জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস দৌলদিয়া হয়ে ঢাকায় ফিরছিল। গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৫টার দিকে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

ফায়ার সর্ভিসের ফরিদপুর স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, বাসটি নদীর ৭০ থেকে ৮০ ফুট গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ এসে রাত ১১টার দিকে বাসটিকে নদী থেকে উদ্ধার করে। বুধবার রাতেই ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের ডুবুরীরা ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন বৃহস্পতিবার অপর ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল বাসটি। হঠাৎ এটি চলতে শুরু করে। তখন চালক আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এটি পন্টুন পেরিয়ে উল্টে পদ্মায় পড়ে; সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায় নদীতে। এখানেও চালকের অবহেলাকে দায়ি করছেন অনেকে।

এ দুর্ঘটনায় দিনাজপুরের নাসিমা বেগমের মৃত্যু হয়। তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় ধ্বংসস্তূপে তিন দিন আটকে থাকার পর উদ্ধার হয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও দৌলদিয়া ফেরিঘাটের এ দুর্ঘটনা তাকে বাঁচতে দিল না। 

জানা গেছে, সারা দেশে ঈদের পরদিনই (২২ মার্চ) সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন, ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন, হবিগঞ্জে বাসের সঙ্গে পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন, টেকনাফে দুইজন, কক্সবাজারে একজন, চট্টগ্রামে একজন, নাটোরে একজন, সুনামগঞ্জে একজন, কিশোরগঞ্জে দুইজন এবং কুড়িগ্রামে একজন নিহত হয়েছেন। 

এরমধ্যে গত ২১ মার্চ (ঈদের দিন) দিনগত রাত ৩টা ১০ মিনিটে কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ মডেল থানার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় যশোর থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ নামে একটি যাত্রীবাহী বাসে সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন। ট্রেনটি এক কিলোমিটার দূরে কচুয়া চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে থেমে যায়। ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে বাসটি আটকে ছিলো। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিনজন শিশু ছিলো। নিহত ১২ জনের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের একই পরিবারের তিনজন রয়েছেন।

দুই গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলায় এ দুর্ঘটনা হয় বলে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের তদন্তে ওঠে আসে। কর্তব্যরত গেটম্যান রেলক্রসিংয়ের গেট বন্ধ না করায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনার সময় দুই গেটম্যান মো. হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসান কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর তারা পালিয়ে যান। তাদের দুজনকেই বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় দুই গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)।

অপরদিকে ঈদের পরদিন রোববার ছিল ছিল গায়ে হলুদ ও পরদিন ছিলো বিয়ে। আনন্দঘন এমন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় জুলফিকার আলি জিল্লু নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন সকালে সকালে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের গড়মাটি কলোনি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত জিল্লু পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া নওদাপাড়া গ্রামের আনছারুলের ছেলে। বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি বনপাড়ায় বোনের বাড়ি থেকে বোন ও দুলাভাইকে আনতে যাচ্ছিলেন। পথে এই দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। সকাল ৮টার দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার ব্যবহৃত গাড়িটি সড়কের পাশে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পাশে পার্কিং করা একটি ট্রাকের নিচে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান এ তত্য নিশ্চিত করেন।

এদিকে ঈদে নানার বাড়ি যাওয়া হলো না শিশু সাউদার। কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলায় মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাউদা খাতুন (১১) নামে এই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা-মা গুরুতর আহত হয়েছেন। ঈদের পরদিন বিকালে উপজেলার চর রাজিবপুর ইউনিয়নের বটতলা কারিগরপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদের পরদিন শিশুটি তার বাবা-মা’র সাঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে তার নানার বাড়ি যাচ্ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দুর্ঘটনায় পথেই তার মৃত্যু হয়।

অপরদিকে ঈদে গ্রামে ফেরার পথে গত ১৮ মার্চ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর সদরঘাটে ট্রলার দিয়ে লঞ্চে উঠতে গিয়ে অপর একটি লঞ্চের চাপায়  পিষ্ট হয়ে বাবা-ছেলে নিহত হন। 

সদর ঘাটে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা সোহাগ রানা বলেন, ১৮ মার্চ বিকেলে এমভি জাকের সম্রাট-৩ এবং এমভি আসা-যাওয়া-৫ নামের দুটি লঞ্চ ঘাটে ছিল। এমভি জাকের-৩ লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলার সময় এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চ পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এ সময় ছেলে সোহেল ও তার বাবা মিরাজ ফকির লঞ্চের চাপায় পিষ্ট হয়ে মারা যান যান। এ ঘটনায় ছেলে সোহেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী গুরুতর আহত হন।

এছাড়া, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলায় ট্রেনের ছাদে থাকা এক অজ্ঞাত যুবক ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিহত হয়েছেন। গত ১৯ মার্চ দুপুরে উপজেলার কালিকাপুর রেলওয়ে ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলার পোড়াদহ থেকে ছেড়ে আসা গোয়ালন্দগামী শাটল ট্রেনটি কালিকাপুর রেলওয়ে ব্রিজ অতিক্রম করছিল। এ সময় ছাঁদে থাকা ওই যুবকের মাথা ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে তিনি গুরুতর আঘাত পান। পরে ট্রেনটি দুপুর ২টার ৩৯ মিনিটে কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা মরদেহটি নামিয়ে ফেলেন।

এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহাণির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ঈদযাত্রা শুরুর দিন গত ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার দিন ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে সড়ক, নৌ ও রেলপথে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া পঙ্গু হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ হাজার ১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন। চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে গত ১৫ দিনে দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। 

তিনি আও বলেন, মূল কারণ ইঞ্জিনিয়ারিং ফেইলিওর। অর্থাৎ সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা সড়ক, নৌ ও রেলপথ দুর্ঘটনার মূল কারণ। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। অবস্থা এমন হয়েছে যে, যুদ্ধ পরিস্থিতির মত জরুরি চিন্তা করে দুর্ঘটনার বিষয়গুলো মোকাবেলা করতে হবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন