Logo

জাতীয়

পৌর এলাকায় সাইনবোর্ডের ব্যবহার

শৃঙ্খলা ও সচেতনতা জরুরি

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০১:০৩

পৌর এলাকায় সাইনবোর্ডের ব্যবহার

একটি শহরের সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও নাগরিক সচেতনতার অন্যতম প্রতিফলন ঘটে তার সড়ক, স্থাপনা এবং দৃশ্যমান উপাদানগুলোর মধ্যে। এর মধ্যে সাইনবোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসা-বাণিজ্য, দিকনির্দেশনা, সরকারি-বেসরকারি সেবা সবকিছুর ক্ষেত্রেই সাইনবোর্ড অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের বেশিরভাগ পৌর এলাকায় সাইনবোর্ড ব্যবহারে যে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও আইন অমান্যের প্রবণতা দেখা যায়, তা শুধু নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পৌরসভা আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় সাইনবোর্ড স্থাপন, আকার, ভাষা, অবস্থান ও কর সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই দুর্বল। ফলে যেখানে-সেখানে, যেভাবে খুশি সাইনবোর্ড বসানো হচ্ছে রাস্তার উপর ঝুলন্ত, ফুটপাত দখল করে, এমনকি বিদ্যুতের খুঁটি বা গাছের গায়েও। এতে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং শহরের নান্দনিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেশের পৌরসভা আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সাইনবোর্ড স্থাপন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। নির্ধারিত ফি বা কর পরিশোধ করাও বাধ্যতামূলক। সাইনবোর্ডের আকার, উচ্চতা, অবস্থান সবকিছুই নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। বিশেষ করে রাস্তার ওপর ঝুলন্ত বা বিপজ্জনক অবস্থানে থাকা সাইনবোর্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এছাড়া ভাষার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষা ব্যবহার করা হয়, তবে তা যেন বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে না হয়, এই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। ভাষার এই দিকটি শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত।

কিন্তু এসব বিধি-বিধান অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ছোট দোকান-অনেকে নিয়ম না মেনে সাইনবোর্ড ব্যবহার করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই দোকানে একাধিক সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে, যা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং বিভ্রান্তিকরও। আবার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রচারণার সাইনবোর্ডও প্রায়ই নিয়ম ভেঙে বসানো হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই বিশৃঙ্খলার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব। পৌর কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পর্যাপ্ত নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি। অনেকেই জানেন না যে সাইনবোর্ড বসানোর জন্য অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মও এর পেছনে ভূমিকা রাখে, যেখানে নিয়ম ভেঙেও সাইনবোর্ড বসানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এ অবস্থায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, পৌর কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় হতে হবে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ সাইনবোর্ড অপসারণ করতে হবে এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাইনবোর্ড অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজেই নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত হন। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে জানাতে হবে- সাইনবোর্ড শুধু একটি ব্যবসায়িক উপকরণ নয়, এটি শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিকভাবে সাইনবোর্ড ব্যবহার করা মানে শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তৃতীয়ত, সাইনবোর্ডের নকশা ও মান নিয়েও ভাবতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে সাইনবোর্ডের জন্য নির্দিষ্ট ডিজাইন গাইডলাইন থাকে, যাতে একটি শহরের সামগ্রিক চেহারা সুসংগঠিত থাকে। আমাদের দেশেও এমন গাইডলাইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এতে করে শহরের সৌন্দর্য বাড়বে এবং একটি আধুনিক নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। ডিজিটাল সাইনবোর্ড বা এলইডি ডিসপ্লে এখন অনেক জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি, যাতে তা অন্যদের জন্য বিরক্তিকর বা বিপজ্জনক না হয়। অতিরিক্ত আলো বা চলমান বিজ্ঞাপন অনেক সময় চালকদের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

সবশেষে বলতে হয়, সাইনবোর্ড ব্যবহারের শৃঙ্খলা একটি ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব অনেক বড়। এটি একটি শহরের পরিচয় বহন করে, নাগরিকদের রুচি ও সচেতনতার প্রতিফলন ঘটায়। তাই এই বিষয়টিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

পৌর এলাকায় সাইনবোর্ড ব্যবহারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতা এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ নগর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব।

শহর আমাদের সবার, তাই এর সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। এখন সময় এসেছে, সাইনবোর্ড ব্যবহারে নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের খবর /এম এ 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন