জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার
সরকারি দল ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
এম. ইসলাম
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৩৭
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত বেশকিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে সৃষ্ট সংকট কাটাতে রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, চলমান বাস্তবতায় কেবল সংবিধানের ব্যাখ্যা সামনে এনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করা যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করে সমস্যা সমাধাদের তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
ইতিমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের ফলাফল কার্যকরে সংস্কার পরিষদ গঠন, গণভোট, পুলিশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, দুদক কমিশনার নিয়োগ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মাঝে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
খোদ সংসদ থেকে বিষয়টি এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদের চলমান অধিবেশনের এ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মাঝে ব্যাপক উত্তাপও ছড়াচ্ছে।
রোববারের অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে উত্তাপ ছড়ায়। ওই দিন অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের লিখিত নোটিশের পর বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার দুই ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে দুই দলের মধ্যে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ ছড়ায়। তবে, উভয় পক্ষই বিষয়টির সমাধানে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে একমত হলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বিএনপি সংবিধান সংশোধন চাইলেও জামায়াত চায় সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন চায়। এই ইস্যুতে বিরোধী দল বুধবার ফের ওয়াক আউট করেছে।
এর আগে পাশাপাশি যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠকেও মতভেদ তৈরি হয়। সংসদে বিষয়টির সমাধান না হলে আগামীতে বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল রাজপথে গেলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাগিব রউফ চৌধুরী মনে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘সংবিধানের আলোকে সমাধান করতে গেলেও বিষয়টিতে রাজনৈতিক সেটেলমেন্টে দরকার। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় জুলাই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। যা বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটসহ কিছু বিষয়ে অনেক দলের সঙ্গে আগেই মতপার্থক্য রয়েছে বিএনপির। তাই গ্রহণযোগ্য ও আইনগত সমাধানে বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান প্রয়োজন।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোট নিয়ে এ মুহূর্তে অযৌক্তিক বিতর্ক করা হচ্ছে। গণভোট হয়ে গেছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতেছে এটি এখন বাস্তবতা। তিনি রোমান আইনের ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালে’ নীতির উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা বৈধ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
তার মতে, বাস্তবায়নে প্রধান বাধা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। গণভোটের রায় মানার কোনো বিকল্প নেই।
বাস্তবায়নে সমস্যা কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আসলে সংসদে বিএনপির এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই এটি বাস্তবায়নে তাদের মতো করে চিন্তা করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এগুলো বাস্তবায়নে বিএনপির পলিটিক্যাল সদিচ্ছার প্রয়োজন পড়ছে।”
আরেক সিনিয়র আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু হেনা রাজ্জাকীর মতে, ‘গণঅভ্যুত্থান, সরকার পতন, পতনের পর সরকার প্রধানের পালিয়ে যাওয়া কোনো সংবিধানে লেখা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারও সংবিধানে লেখা নেই। ওই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুললে বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কারণ, সংবিধান মানলে ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন নেই। তাই এগুলো নিয়ে আর বাড়াবাড়ি বা তর্কে না গিয়ে সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক যে কমিটমেন্ট তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে কাউকে সরে আসা উচিত হবে না।’
এদিকে, গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট করেছে সরকার ও বিরোধী পক্ষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গণভোট অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এটি স্থায়ী আইন নয়, তাই নতুন করে বিল আকারে পাস করার প্রয়োজন নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেগুলো সময়মতো বিল আকারে আসবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপস করবে।’
তবে এ অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির। তার দাবি, ‘‘গণভোট অধ্যাদেশকে ল্যাপস করা সঠিক নয়। গণভোটের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে ‘লিগ্যাল ক্যাওয়াজ’ তৈরি হতে পারে। সংসদে সরকারি দলের মন্ত্রীদের ব্যাখ্যা সঠিক নয় বলেও দাবি করেন।”
অধ্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন, দুদকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ বাতিল হলে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলেও আশঙ্কা তার।’
এদিকে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটিতেও ঐকমত্য হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি অধ্যাদেশ নিয়ে মতভেদ তৈরি হলে রোববারের বৈঠকেও অন্তত ১৮টির বিষয়ে অনৈক্য রয়ে গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, বিশেষ কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকারি দল কিছু অধ্যাদেশ সংশোধন ও কিছু বাতিল করতে চায়, কিন্তু আমরা তাতে একমত হতে পারিনি।’
ওই বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বৈঠকে অনেক অধ্যাদেশ বর্তমান অবস্থাতেই পাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে আনা হবে। তবে সময় স্বল্পতার কারণে আগামী ১০ তারিখের মধ্যে সব বিল আনা সম্ভব না হলে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে আবার বিল হিসেবে উত্থাপন করা হবে। এছাড়া বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বিশেষ কমিটির রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন করা হবে।’
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

