যুদ্ধের প্রভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটার শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১২
যুদ্ধঘন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহকে ঘিরে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক সময়ে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেনÑ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের চাকরি হারানো, বেতন বন্ধ হওয়া বা দেশে ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়তে পারে, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের তাগিদ দিচ্ছেন, যদিও সরকার বলছেÑ পরিস্থিতির ঝুঁকি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর ইতিবাচক ফল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। এটি রিজার্ভ শক্তিশালী করে, দারিদ্র্য কমায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। এর বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, অর্থবছর শেষে এ হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসে রেকর্ড ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এরই মধ্যে অনেক শ্রমিক বাইরে যেতে পারছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ছাঁটাই করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল, অনেক শ্রমিক বাধ্যতামূলক ছুটিতে দেশে ফিরে আসেন। এতে ২০২০-২১ অর্থবছরে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়লেও পরবর্তী সময়ে তা কমে যায় এবং বেকারত্ব বাড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারও যুদ্ধ দীর্ঘ হলে একই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। মার্চে ঈদুল ফিতরের কারণে প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন, তবে বর্তমানে অনেকেই কাজে যেতে পারছেন না। কাজ বন্ধ থাকলে বেতনও বন্ধ হতে পারে, এমনকি একসময় দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। যদিও সবার প্রত্যাশা, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।
আরিফ হোসেন খান জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। মার্চ মাসে রেমিট্যান্স বেশি আসার প্রধান কারণ ছিল ঈদুল ফিতর। সাধারণত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় প্রবাসীরা পরিবারের জন্য বেশি করে অর্থ পাঠান, যার ফলে এ সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে।
এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরকার প্রবাসীকর্মীদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যা শিগগির দৃশ্যমান হবে। এর সুফল সাধারণ মানুষও অচিরেই দেখবে।
ওই সময় মন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের জন্য বন্ধ থাকা বাজারগুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং রমজানের কারণে এই কাজ কিছুটা মন্থর। আশা করছি আগামী মাস (এপ্রিল) থেকে এই প্রক্রিয়ায় আরও গতি আসবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডান থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫০ কোটি ৫৬ লাখ ডলার।
এর আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আর থেকে এসেছিল ৪২৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আসে ২৭৪ কোটি ১৪ লাখ ডলার। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ৪৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছিল ৫৭২ কোটি ১৪ লাখ ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছেরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮২ কোটি ১৫ লাখ ডলার। দেশটি থেকে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ৪১৬ কোটি ৭৯ লাখ ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩০৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার আসে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ২০৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছিল ২৪৪ কোটি ডলার।
ওমান থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এসেছে ১৩০ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৬৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১২ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ৮৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ১৫৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) কাতার থেকে ১০০ কোটি ৪১ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১২০ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৫ কোটি ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে আসে ১৩৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪৫ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে।
কুয়েত থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ১১২ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১৬২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪৯ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৬৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ১৮৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।
বাহরাইন থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এসেছে ৫৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা এসেছিল ৭৬ কোটি ১১ লাখ ডলার। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৩ কোটি ৯২ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮৩ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স আসে।
একইভাবে জর্ডান থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এসেছে ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার আসে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ১৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ১৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট তীব্র হতে পারে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির কারণে তেল-গ্যাস সরবরাহ এরই মধ্যে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিশ্বজুড়ে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরিস্থিতি খারাপ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হবে, ফলে প্রবাসীরা চাকরি হারাতে পারেন। এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ প্রবাসী আয়নির্ভর দেশগুলোতে। এর ফলে এসব দেশের রেমিট্যান্স আয়, যা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, চলমান যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্সে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি হবে না। প্রবাসীরা সাধারণত অস্থায়ীভাবে বিদেশে থাকেন এবং দেশে পরিবার থাকায় নিয়মিত টাকা পাঠানোর চেষ্টা করেন। যদিও কিছু অর্থ অনানুষ্ঠানিক পথে আসে, মোট রেমিট্যান্সে বড় পরিবর্তন হবে না।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে বেতন পেতে দেরি, জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি এবং নতুন শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া ও কাজে ফেরা কিছুটা ধীর হতে পারে। তবে তার মতে, চলতি বছরে রেমিট্যান্স সামান্য কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। কোভিড-১৯ সময়ের মতোই, প্রবাসীরা কষ্ট করে হলেও টাকা পাঠানো অব্যাহত রাখবেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলে প্রভাবও সাময়িক থাকবে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এখনো সামগ্রিকভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেনি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর থাকলেও ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাস বা মজুরি কমার স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তেল উত্তোলন ও রপ্তানি চালু থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও খুব বেশি বাড়েনি, ফলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা এখনো বজায় রয়েছে। মার্চে ঈদ থাকায় রেমিট্যান্স বেড়েছিল, তাই পরবর্তী মাসগুলোতে প্রবাহ কেমন থাকে সেটিই এখন দেখার বিষয়। অনেক শ্রমিক চলমান পরিস্থিতিতে কাজে যেতে পারছেন না, প্রতিষ্ঠানগুলোও দীর্ঘদিন বসিয়ে রেখে বেতন দিতে পারবে না। সব মিলিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্সের ওপর।
তিনি বলেন, বর্তমানে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসা স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়া ঠিক নয়। কোরবানির ঈদে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, কিন্তু তা যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। এছাড়া নতুন কর্মী পাঠানো কমে গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

