Logo

জাতীয়

আমদানি বাড়লেও কাটছে না জ্বালানি সংকট

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪৪

আমদানি বাড়লেও কাটছে না জ্বালানি সংকট

ছবি: সংগৃহীত

গত মার্চে শুরু হওয়া ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসেও বদলায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শর্ত সাপেক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ হলেও এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জ¦ালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারেনি। যদিও বাংলাদেশে গত বছরের তুলনায় বেশি জ্বালানি আমদানি হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিগগিরেই চলমান জ্বালানি সংকট কাটার কোনো আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

সর্বশেষ দুদিন আগে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হতে পারে এমন খবরে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল সেটা আবারও এক ধরনের শঙ্কায় রূপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় যে শঙ্কা, সেখানে বাংলাদেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের জোগান ও সরবরাহব্যবস্থা নাজুক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পেট্রোলপাম্পগুলোতে লাইন ছোট হওয়ার পরিবর্তে আরও বড় হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে সরকার বলছে, জ¦ালানি তেলের সংকট নেই। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। ফলে সংকট হচ্ছে। কার্যত আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে জ¦ালানি তেল বিক্রিতে অলিখিত রেশনিং চলছে। শুধু গণপরিবহনের নয়, বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও পর্যাপ্ত জ¦ালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে শিল্প মালিকদের মধ্যেও শিল্পকারখানা চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অবশ্য জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার যে তথ্য সরকার দিচ্ছে তা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) জ্বালানি আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। এই সময়ে বাংলাদেশ ৫৭ দশমিক চার লাখ টন জ¦ালানি আমদানি করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিলো ৫০ দশমিক পাঁচ লাখ টন। আমদানিকৃত জ¦ালানি দেশে আনতে মোট ব্যয় হয় ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি ২১ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিলো ৪১ হাজার ৬৬৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। 

অর্থাৎ সরকার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে গত নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ হাজার ৭৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। বাড়তি ব্যয়ের পরও জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে পর্যাপ্ত জ¦ালানির সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। তা সত্ত্বেও ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি নিয়ে স্বস্তি মিলছে না। এমনকি কবে নাগাদ চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জ্বালানির সরবরাহ ঠিক হবে- তা নিয়েও কোনো স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না।

আমদানি বাড়া সত্ত্বেও এ বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকে সারা দেশে জ¦ালানি সংকট দেখা দিতে শুরু করে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়; কিছু পাম্প সাময়িকভাবে জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করছেন, সমস্যাটি যতটা না আমদানিতে, তার চেয়ে বেশি বিতরণে।

এমনও অভিযোগ আছে- দেশে জ্বালানি তেল আহরণে বেশি তৎপর অনেকে। তাদের অনেকে জ্বালানি তেল মজুত করছে। আর এর সঙ্গে পাম্পগুলোর সংশ্লিষ্টরা জড়িত থাকার অভিযোগও এসেছে। অবশ্য সরকার মজুত জ্বালানি তেল জব্দ করার চেষ্টা করছে। 

বিপিসি যদিও জ্বালানি সংগ্রহের কাজ করে, তবে এর বিতরণ ব্যবস্থা তিনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়- পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলোই দেশজুড়ে ডিলারদের জ্বালানি সরবরাহ করে।

পরিসংখ্যান বলছে, সংকট শুরু হওয়ার ঠিক আগে জ্বালানি সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চের মধ্যে এই তিনটি কোম্পানি মিলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন ডিজেল বরাদ্দ দিয়েছেÑ যা স্বাভাবিক ১২-১৩ হাজার টন চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। মাত্র সাত দিনে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে, যা প্রত্যাশিত ৮৪ হাজার টনের চেয়ে অনেক বেশি। এর অর্থ হলো, ১৬ দিনের স্বাভাবিক ব্যবহারের সমান জ্বালানি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানির পরিমাণের তুলনায় ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য বিশ্ববাজারে জ¦ালানির চড়া দাম ও ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে ব্যয়ের এই বিশাল উল্লম্ফন অনেককেই বিস্মিত করেছে। জ¦ালানি ব্যবহার এবং আমদানি ব্যয়- দুই ক্ষেত্রেই এই আকস্মিক বৃদ্ধি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সরকারের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত: জ্বালানি সংকটে অন্যান্য খাতের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। দেশে ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে এখন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে (ন্যাশনাল গ্রিডে) প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র ১০ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। উৎপাদন সক্ষমতার ৬৫ ভাগ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। উৎপাদনে না থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কোনো কোনোটিকে সরকার বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিদেশি ঋণের মোটা অঙ্কের সুদের টাকা গুনতে হচ্ছে।

একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র চার হাজার মেগাওয়াট। এ খাতের প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে শুধু গ্যাসের অভাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট। কয়লার জোগানের অভাবে এ খাতের প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না। আর তেলভিত্তিক (এইচএফও) ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। 

এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত ও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎসহ বর্তমানে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমান গ্রাহক চাহিদার কাছাকাছি। তবে গ্রীষ্মের ভরা মৌসুমে এ চাহিদা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। চলমান জ্বালানি সংকট বজায় থাকলে আসন্ন দিনগুলোতে বিদ্যুতে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

পোশাক শিল্পেও সংকট: শুধু গণপরিবহন কিংবা বিদ্যুৎ খাতেই নয়, উৎপাদন খাতেও জ¦ালানি সংকট ধিরে ধিরে তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে খবর মিলছে। ফলে শিল্প মালিকদের মধ্যেও শিল্পকারখানা চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গাজীপুর অঞ্চলের একাধিক শিল্প মালিক বলেন, তারা নিয়মিত বিভিন্ন ডিলারের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতেন। কোনো কোনো কারখানায় মাসে নয় হাজার লিটারের তিন-চার গাড়ি ডিজেল প্রয়োজন হতো। এখন ডিলাররা জ্বালানি তেল দিতে পারছে না ঠিকমতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম বেশি দাবি করছে। তবে বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছে না।

এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিভিন্ন শিল্প মালিক আগে তাদের প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেল ডিপো বা অনেক ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক তেল সংগ্রহ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক শিল্প মালিক ঠিকমতো জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে আমি জ্বালানিমন্ত্রী, বিপিসির চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা নিশ্চিত করছেন যাতে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। 

তিনি আরো বলেন, বাস্তবতা হলো বিভিন্ন জেলাপর্যায়ে ডিপোগুলো থেকে শিল্প মালিকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার অর্ধেক বা কিছুটা কমিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। যে কোনোভাবেই হোক শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলেও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন