কোনটায় কত বাড়ল
দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২
ছবি: সংগৃহীত
অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যে এবার দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল। শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হচ্ছে।
এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)।
এর আগে বেশ কয়েক মাস ধরে এ চার ধরনের তেলের দাম প্রায়ই একই রকম ছিল। সবশেষ এপ্রিলেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। আর এর আগের কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সমন্বয় করতে বাড়ানো বা কমানো হলেও তা এক দুই টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার চড়তে থাকার কারণে এবার এক লাফে তা ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হল।
শনিবার নতুন দর নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এর আগে জেট ফুয়েলের দর বাড়ানো হয় কয়েক দফায়। দাম বেড়েছে ফার্নেস অয়েলেরও।
সরকারের তরফে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর কথা বলা হলেও ৭ এপ্রিল ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল প্রয়োজন হলে মে মাসে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে ভর্তুকির চাপ সামলাতে এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল সরকার।
জ্বালানি তেলের নতুন দর নির্ধারণের এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণের পরের কিস্তির অর্থ পেতে জোর দেন দরবার চালাচ্ছে সরকার।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে জনস্বার্থে ভর্তুকি বাড়ানোর কথা বলেছিলেন।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়ানোর ঘোষণা এল।
সবশেষ ৩১ মার্চ রাতে এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম ঘোষণার সময় তা অপরিবর্তিত রেখেছিল সরকার। তখন ভোক্তা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। ওই কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে মিল রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় বেড়ে গেছে। এখন সরবরাহ বাড়িয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সংস্থাটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বাড়তি তেল সরবরাহ করতে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে।
গত শুক্রবার জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে ইরান শনিবার আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এক লাফে সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। যদিও সমালোচনার মুখে একই মাসে পাঁচ টাকা কমানো হয়েছিল দাম।
এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্য জ্বালানি তেলের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। আর কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই মাসে আবার দাম পাঁচ টাকা কমিয়ে ১৩০ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জ্বালানি তেলের মধ্যে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আর নির্বাহী আদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের একমাত্র সরকারি সংস্থা বিপিসি। তাদের অধীনে থাকা তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে তারা।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পেট্রলপাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। তবে গত বছর একই দিনে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এটা মানতে গিয়ে গত বছরের চেয়েও তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এখন গত বছরের তালিকা ধরে তার থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে ফিলিং স্টেশনের নামে দৈনিক তেল সরবরাহের বরাদ্দপত্র তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে। পাম্পের বর্তমান বিক্রি, মানুষের ভিড় বিবেচনায় নিয়ে চাহিদা মূল্যায়ন করবে জেলা প্রশাসন। এর ভিত্তিতে তেল সরবরাহ বাড়ানোর সুপারিশ করবে তারা।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে মূল হলো ডিজেল, যা মোট জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় কিছুটা টানাপোড়ন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ছয়টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুত কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কের কারণে বাড়তি জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এরপর ডিজেলের সরবরাহ কমানো হয়। বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। ইতিমধ্যে পুরোনো সরবরাহকারীরা ডিজেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় এক লাখ দুই হাজার টন। ডিজেল নিয়ে আসা আরও চারটি জাহাজে এক লাখ টনের বেশি মজুত যুক্ত হচ্ছে। এর বাইরে আরও ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা চাইলে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। আরও আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এক বছরের তুলনায় পরবর্তী বছরে চার থেকে পাঁচ শতাংশের বেশি চাহিদা বাড়ার কথা নয়। বাজারে যে অস্বাভাবিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে যৌক্তিক নয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট, ভোগান্তি হচ্ছে। তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা হচ্ছে।
পেট্রলপাম্প মালিকেরা বলছেন, অকটেন ও পেট্রলের জন্যই মূলত মানুষ ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে। তাই এগুলোর সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে সব তেল বিক্রি হয়ে যায়। তবে শুধু পেট্রলপাম্পে নয়; এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলারসহ সবাইকে তেল সরবরাহ করতে হবে। না হলে সব গ্রাহকের চাপ পেট্রলপাম্প সামলাতে পারবে না। বিশেষ করে সব বিক্রয় প্রতিনিধির কাছে ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে হবে।
মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসে সাধারণত জ্বালানি তেল হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়। বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ছয় শতাংশ অকটেন। গত অর্থবছরে দেশে চার লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

