ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়েছে সরকার। লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ফলে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের নতুন দর রোববার কার্যকর হলেও ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমেনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকারের দাবি- আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাধ্য হয়েই এ সিদ্ধান্ত, আর সংকটের পেছনে রয়েছে প্যানিক বায়িং ও মজুতদারির প্রবণতা।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন ভাড়া, নিত্যপণ্যের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ে পড়তে শুরু করেছে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। সর্বশেষ খবরে পরিবহন ভাড়া বাড়তে শুরু করেছে। সরকারের কাছে সব ধরনের পরিবহন খরচ বাড়ানোর প্রস্তাবনাও তৈরি করেছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে এলপিজি দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা জনদুর্ভোগ আরও বাড়াবে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
সরবরাহ বাড়াতে বিপিসির উদ্যোগ, প্রশাসনিক নজরদারি ও মজুতবিরোধী অভিযানের মধ্যেও পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে; ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমালেও দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও পড়বে এবং এতে সামগ্রিক ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
এদিকে সরকার যৌক্তিক ও বাধ্য হয়ে দাম বৃদ্ধি বললেও বিভিন্ন দল ও সংগঠন দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছে।
সরকারের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার রোববার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এদিকে, সরকারের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছে পাম্প মালিক সমিতি। এর ফলে মজুতের প্রবণতা কমবে এবং বিক্রিতে স্বচ্ছতা আসবে বলেও মনে করেন তারা।
জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর রোববার বেড়েছে এলপিজির দাম। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সেটি হলে বর্তমান ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ আরও বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে এবং তেল সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বাড়ালেও তেলের সরবরাহ বাড়বে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়।
ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি সরকারকে আপাতত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় থেকে সামান্য স্বস্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতিকে আরও কতটা চাপের মুখে পড়তে হবে তা এখনো অজানা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম এর মধ্যেই অনেকাংশে বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এমনকি দেশে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আবার কাঁচামালের পাশাপাশি বিদেশ থেকে পণ্য আনা এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য পরিবহন খরচও বেড়েছে।
কৃষকরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বোরো চাষে উৎপাদন খরচ বেশ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
এখন তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর স্থানীয় গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ছে, এমনকি রাইড শেয়ারের বাইকের ভাড়াও বাড়তি নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আবার পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বাজারে নিত্য পণ্যের দাম ছাড়াও কৃষি, শিল্প উৎপাদনসহ এই তেলের মূল্য বৃদ্ধি অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলেও আশঙ্কা করছেন ভোক্তা এবং অর্থনীতিবিদরা।
সরকার চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
গত শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
ওইদিন রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ¦ালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।
এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)।
এর আগে বেশ কয়েক মাস ধরে এ চার ধরনের তেলের দাম প্রায়ই একই রকম ছিল। সবশেষ এপ্রিলেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। আর এর আগের কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সমন্বয় করতে বাড়ানো বা কমানো হলেও তা এক দুই টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
শনিবার নতুন দর নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এর আগে জেট ফুয়েলের দর বাড়ানো হয় কয়েক দফায়। দাম বেড়েছে ফার্নেস অয়েলেরও।
জ্বালানি তেলের নতুন দর নির্ধারণের এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণের পরের কিস্তির অর্থ পেতে জোর দেন দরবার চালাচ্ছে সরকার।
সবশেষ ৩১ মার্চ রাতে এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম ঘোষণার সময় তা অপরিবর্তিত রেখেছিল সরকার। তখন ভোক্তা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। ওই কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে মিল রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় বেড়ে গেছে। এখন সরবরাহ বাড়িয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সংস্থাটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বাড়তি তেল সরবরাহ করতে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে।
গত শুক্রবার জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে ইরান শনিবার আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এক লাফে সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। যদিও সমালোচনার মুখে একই মাসে পাঁচ টাকা কমানো হয়েছিল দাম।
এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্য জ্বালানি তেলের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। আর কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই মাসে আবার দাম পাঁচ টাকা কমিয়ে ১৩০ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের একমাত্র সরকারি সংস্থা বিপিসি। তাদের অধীনে থাকা তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এক বছরের তুলনায় পরবর্তী বছরে চার থেকে পাঁচ শতাংশের বেশি চাহিদা বাড়ার কথা নয়। বাজারে যে অস্বাভাবিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে যৌক্তিক নয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট, ভোগান্তি হচ্ছে। তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা হচ্ছে।
সরবরাহ বেড়েছে: রোববার থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ, পেট্রোল ও ডিজেল ১০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে। অথচ সরবরাহ এতদিন দেওয়া হচ্ছিল গত বছরের গড় হিসেবে। ফলে বাড়তি চাহিদা পূরণ না হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে এখন জেলা প্রশাসনের সহায়তায় পাম্পভিত্তিক নতুন বরাদ্দ নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
দাম সমন্বয়ে স্বস্তি, মজুত প্রবণতা কমার আশা: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে দাম নির্ধারণ করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি।
সংগঠনটির সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানি তেলের অপ্রয়োজনীয় মজুত প্রবণতা কমবে এবং বিক্রয় ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা আসবে বলে তারা মনে করেন।
তবু পাম্পে দীর্ঘ সারি: রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ার পরও রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের সারি ছোট হয়নি। অন্যদিকে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছেন মোটরসাইকেল চালকেরা।
রোববার রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়েও হতাশার চিত্র দেখা গেছে। সরবরাহ কম থাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, এরপরও দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন গ্রাহকেরা।
তালতলার বেগম রোকেয়া সরণিতে অবস্থিত মেসার্স হাসান ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টারের অপারেটর সুজন মিয়া জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে তারা প্রতিদিন ৯ হাজার লিটার তেল সরবরাহ পেতেন। বর্তমানে চাহিদা প্রায় ৩০ হাজার লিটার হলেও গড়ে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘এক-দুই ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের লাইন তো থাকেই। এরপর লাইনে থাকা লোকজন চেঁচামেচি শুরু করেন।’
একই পাম্পে অপেক্ষমাণ মেরাজ হোসেন বলেন, ‘শনিবার সকাল ১১টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। বিকাল ৪টা পর্যন্ত লাইনে থেকেও তেল পাইনি। ওরা বলল তেল শেষ। রোববার সকাল ১০টার দিকে এসে আবার দাঁড়িয়েছি, কিন্তু তেল পাব কি না, বুঝতে পারছি না।’
পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে-সংসদে জ¦ালানিমন্ত্রী: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ও কালোবাজারি করছে। ফলে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে।
রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ কথা বলেন।
‘দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই’Ñ সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের এমন বক্তব্য যথার্থ বলে মন্তব্য করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকার গত বছরের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে, চলতি বছরের মার্চে একই পরিমাণ তেল সরবরাহ করেছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন থেকে মোটরবাইকে ২০০ টাকার ফুয়েল প্রদান বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে ‘প্যানিক বায়িং’ ও মজুতপ্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সারা দেশে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও বিপিসি ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অবৈধ মজুতদারকে আইনের আওতায় এনে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। মজুত ও কালোবাজারি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে।
তিনি সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে দেশে তেলের দাম খুব সামান্য বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যে দামে তেল পাওয়া যেত, এখন সেই দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে। এতে করে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে আমাদের ওপর সরাসরি চাপ পড়ছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি হয়তো সরকারের নিরুপায় সিদ্ধান্ত। তবে শুল্কসহ মূল্য বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সমন্বয় করতে হবে যাতে ভোক্তাকে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি মূল্যে কিছু কিনতে না হয়।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, এখন বিদ্যুতের দামও যদি বাড়ানো হয় তাহলে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে বিকল্প উদ্যোগগুলো না নিলে মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে, যা গত মাসেই ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তেলের দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। তার দাবি, তেলের দাম নগণ্যই বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

