Logo

জাতীয়

জ্বালানি সংকটে তীব্র লোডশেডিং, ভোগান্তি

Icon

রায়হান উল্লাহ

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৯

জ্বালানি সংকটে তীব্র লোডশেডিং, ভোগান্তি

ছবি: সংগৃহীত

গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু উৎপাদন সে হারে না বাড়ায় সৃষ্টি হয়েছে বড় ঘাটতি। বর্তমানে চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন সীমাবদ্ধ থাকছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে। এই ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যার বড় অংশই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। 

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা তুলনামূলকভাবে লোডশেডিংমুক্ত থাকছে। ফলে বিদ্যুৎ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।

গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে আমদানি কমে যাওয়া এবং বকেয়া বিলের চাপ- সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন বহুমুখী সংকটে। বাস্তবের লোডশেডিংয়ের সঙ্গে সরকারি তথ্যের অমিল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ জনজীবন, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষায়; বিশেষ করে ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদন কমার আশঙ্কা বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে; জীবিকা নির্বাহেও পড়ছে চাপ। 

একই সময়ে অবৈধ মজুতদারি ঠেকাতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে সরকার, যা বাজার ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সংকট ও অস্থিরতারই ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে, যা দ্রুত সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। 

গ্রামে বাড়ছে লোডশেডিং: বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্ম মৌসুমে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। আর বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে শুরুতেই সরবরাহ কমানো হয় গ্রামে। ঘাটতি বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে শহরে কিছু লোডশেডিং করা হয়। তবে তা গ্রামের তুলনায় অনেক কম।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। এ তিন সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় দুই হাজার ৫০৬ মেগাওয়াট, যার মধ্যে দুই হাজার ২২৯ মেগাওয়াট ছিল আরইবির। কেন্দ্রীয় হিসাবে ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় এক হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট। যদিও আরইবির তথ্য, তাদের লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ১১ মেগাওয়াট।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের লোডশেডিংয়ের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি আরইবি। এ বছরের ২০ এপ্রিল এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করেছে পিজিসিবি। অথচ একই সময়ে আরইবির লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট।

ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এ দুটি সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ডিপিডিসির চাহিদা দুই হাজার মেগাওয়াটের ওপর গেলেও তারা পুরোটা সরবরাহ পাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছে ডেসকোও।

দেশের উত্তরাঞ্চলের শহর এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিক কোম্পানি (নেসকো) বলছে, ১৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৭৩০ মেগাওয়াট চাহিদার সময় ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট ঘাটতি পেয়েছে তারা। এতে কোনো কোনো এলাকায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। এ সংস্থার এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ চাহিদা উঠেছে ৭০৮ মেগাওয়াট, যেখানে ৫০ মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি পেয়েছে তারা। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। জ্বালানির জন্য বাড়ানো হয়েছে আমদানিনির্ভরতা। জ্বালানি আমদানি করতে না পারা এবং বিশ্ববাজার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেই লোডশেডিং বেড়ে যায়।

২০২২ সালের পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের একটি বড় কারণ আবার জ্বালানির জন্য বিদেশনির্ভরতা। আওয়ামী লীগ আমলেই বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে লোডশেডিং করতে হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দিতে হয়েছে ভাড়া। বিএনপি সরকার আসার পর পুরোনো সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট।

এর মধ্যে আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়ার দায় আছে। ৫২ হাজার কোটি টাকার মতো বকেয়া শোধ করতে হবে পিডিবির। বকেয়া শোধে তাগাদা দিয়ে চিঠি দিয়েছে ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানি। আদানির কেন্দ্রটি থেকে এখন দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ আসছে। সময়মতো বিল পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা। এর মাঝেই পিডিবি ও আদানির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর ভারতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। সাউন্ড শুনে এটি শনাক্ত করেন কেন্দ্রটির প্রকৌশলীরা। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পিডিবি বলছে, গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। গত বছরও তারা দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পেয়েছে। এবার গড়ে পাচ্ছে ৯০ কোটি ঘনফুট। এতে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কয়লা রপ্তানি কমিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। এতে দেশের কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কয়লার অভাবে সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পটুয়াখালীর এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ। একই ক্ষমতার চট্টগ্রামের বাঁশখালী কেন্দ্র থেকে অর্ধেকের কম উৎপাদন হচ্ছে। বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে জ্বালানি তেল কিনতে পারছে না তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই সক্ষমতার পুরোটা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। 

দেশে মোট বিদ্যুতের গ্রাহক চার কোটি ৯৭ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে তিন কোটি ৭৭ লাখ গ্রাহক আরইবির। সারা দেশে ৮০টি সমিতির মাধ্যমে এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ বিতরণ করে আরইবি। সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত সোমবার তারা বেলা তিনটা, সন্ধ্যা ৭টা, রাত ৮টা ও ৯টার সময় প্রতি ঘণ্টায় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করেছে।

যুদ্ধের কারণে বেশ কিছু দিন ধরেই কৃষক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। এরসঙ্গে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো হওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এখন তাদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটের ফলে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তারা আরো জানান, যখন পাম্প চালানো প্রয়োজন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকছে না। এভাবে সেচকাজ ব্যাহত হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটের ফলে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। 

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিস সময় কমানো, শপিংমল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছেÑ সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে। 

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা: নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পাম্প থেকে চাহিদামতো ডিজেল কিনতে পারছে না অনেক কারখানার মালিক। জ্বালানি তেলের অভাবে কারখানার নিজস্ব যানবাহনগুলো চলতে পারছে না। আবার ঠিকমতো বিদ্যুৎও থাকছে না। সব মিলে কঠিন সংকটে পড়েছে কারখানার মালিকরা। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়বে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, আরইবির তথ্য প্রমাণ করে, লোডশেডিংয়ের তথ্য ঠিক নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে চাহিদা কমিয়ে দেখানো হয়, এতে ঘাটতি কম দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়। বাস্তবে লোডশেডিং আরও বেশি। ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বিতরণ কোম্পানি, তাই তাদের তথ্যই সঠিক। তিনি আরও বলেন, সারা দেশে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আরইবি। সংস্থাটিকে কম বিদ্যুৎ দেওয়ার মানেই হলো গ্রামের মানুষকে বঞ্চিত করা।

শামসুল আলম আরও বলেন, গ্রামের মানুষকে বঞ্চিত করাটা দুর্ভাগ্যজনক। অথচ বছরের পর বছর ধরে এটি হয়ে আসছে। সমতাভিত্তিক লোডশেডিং হলে তা সবার জন্যই সহনীয় হতো।

পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমেছে, এখনো দুটি কেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা আছে। জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে সব বিতরণ কোম্পানির মধ্যে সুষম হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মঙ্গলবার। 

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। তবে আমরা আশা করছি, লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। তবে ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়াও গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়ছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এবার যদি গরম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে যেতে পারে। 

তেল ছাড়া ‘সংসার চলবে না’, তাই খাওয়া বাদ দিয়ে লাইনে: সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, তা নিয়ে অভিযোগ নেই সাইফুল ইসলামের। তার প্রশ্ন, ফিলিং স্টেশনে লাইন কবে শেষ হবে। কারণ, লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় তার আয় কমে গেছে।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বুধবার বিকেল ৫টায় কথা হয় সাইফুলের সঙ্গে। নিজের মোটরসাইকেলে তেল নিতে বেলা ২টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তিন ঘণ্টায়ও ফিলিং স্টেশনে ঢুকা হয়নি তার।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান সাইফুল। তেল নিয়েই তাকে ফিরতে হবে। তিনি বলেন, ‘তেল না পেলে তো আর সংসার চলবে না।’ দুপুরে রুটি-কলা খেয়েছিলেন, তারপর আর লাইন ছেড়ে খেতে যাননি। ‘এখন খাওয়ার চিন্তা করতে গেলে তেল পাব না,’ জানালেন তিনি। তেল নেওয়ার পরই খেতে যাবেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার ফলে ভুগতে হচ্ছে বাংলাদেশকেও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। মজুতের সংকট আপাতত নেই, সরকার এমন কথা বললেও মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ায় চাহিদা গেছে বেড়ে। চাহিদা-জোগানের ফারাক থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশনের জ্বালানি তেল দিনের প্রথম ভাগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গতকালও লাইন দীর্ঘই ছিল। তেলের জন্য ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি পৌঁছেছিল এক কিলোমিটার দূরে বিএএফ শাহীন স্কুলের বিপরীত পাশ পর্যন্ত। মোটরসাইকেলের লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল তার চেয়ে কম, প্রায় জাহাঙ্গীর গেটের কাছাকাছি পর্যন্ত।

রাজধানীর পূর্ব প্রান্তের মাতুয়াইল থেকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে এসেছিলেন ভাড়ায় মোটরাইকেলচালক মো. নয়ন ইসলাম। দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। লাইনে দাঁড়িয়েই দুপুরে শিঙাড়া আর রুটি খেয়ে নেন।

নয়নও বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু তেলের জন্য এভাবে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর কাজ করা যাবে না।’

বনশ্রী এলাকা থেকে নিজের প্রাইভেট কারের জন্য তেল নিতে আসেন ব্যবসায়ী ইফতেখার মাহমুদ। বিকেলে তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো পাইনি।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ধানমন্ডি থেকে আসা গাড়িচালক মো. মোখলেসুর রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালান তিনি।

অবৈধভাবে মজুতকৃত ৫ লাখ ৭৭ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার: জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতদারি রোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সারাদেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুতকৃত ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯৩ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত এসব অভিযানে সর্বাধিক ৩ লাখ ৯০ হাজার ২০৯ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪০ হাজার ৮৪৬ লিটার অকটেন এবং ৯৭ হাজার ৪৮৩ লিটার পেট্রোল এবং সাড়ে ৪৮ হাজার ফার্নেস অয়েল উদ্ধার করা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১১ হাজার ১৯৭টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৪ হাজার ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অভিযান চলাকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক কোটি ৮০ লাখ ৯৬ হাজার ১১৫ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে। এসময় বিভিন্ন অপরাধে ৫৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন