Logo

জাতীয়

হাওরে কৃষকের কান্না

অকাল বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর ধান

Icon

কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪০

অকাল বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর ধান

"ভাই, সংবাদ কইরা কী আর অইব, আমার সর্বনাশ অয়া গেছে। সোনার ধানগুলা পাইক্কা গেছিল। আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলাম?"ভেজা কাপড়ে হাওরপাড়ে বসে এভাবেই বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার কলিমপুর গ্রামের কৃষক রতন মিয়া। ১০ একর জমিতে ধারদেনা করে আবাদ করা তার স্বপ্নের ফসল এখন গলাডোবা পানির নিচে। রতন মিয়ার এই আহাজারি আজ কেবল একজনের নয়, কিশোরগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের।

গত রোববার বিকেল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি, তুফান আর বজ্রপাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাওরের জনজীবন। একদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে স্থানীয় ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন এবং হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার নিম্নাঞ্চল। কৃষকদের দাবি অনুযায়ী, গত দুই দিনে অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ পাশ্ববর্তী অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অথচ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সোমবার বিকেলে অষ্টগ্রামের হাওরে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে ধান আরও সপ্তাহখানেক পর কাটার কথা ছিল, সেই আধা-পাকা ধানই এখন বুক সমান পানিতে নেমে কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। কেউ নৌকা নিয়ে, কেউ বা কলাগাছের ভেলায় করে ডুব দিয়ে পচা ধান তুলে আনার চেষ্টা করছেন। অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ দিয়েও অনেকে ধান রক্ষা করতে পারছেন না। কাবিল মিয়া নামের এক প্রবীণ কৃষক হাতের মুঠোয় থাকা কালো হয়ে যাওয়া ধান দেখিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তিনি বলেন, "পানির নিচের ধান এহন কেমনে কাটাম? ধান পইচ্চা কালা অয়া যাইতাছে। চোখের সামনে সোনার ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে-কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।"

স্থানীয়দের মতে, এই অকাল বন্যার পেছনে কেবল প্রকৃতি দায়ী নয়। পরিবেশের তোয়াক্কা না করে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটিকে দায়ী করছেন তারা। এছাড়া হবিগঞ্জ সীমান্তের শিবপুর এলাকায় খোয়াই নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় উজানের পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই অষ্টগ্রামের হাওরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। বন্যার শঙ্কা যখন বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র ডিজেল ও শ্রমিক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। হাওরে ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের কৃষকরা।

যদিও কৃষি বিভাগ দাবি করছে ডিজেলের কোনো সংকট নেই, তবে কৃষকরা বলছেন টোকেন পদ্ধতিতে ডিজেল সংগ্রহ করা অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। অনেক সময় ডিলারদের কাছে গিয়েও ডিজেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে হারভেস্টার মালিকদের। এতে করে হারভেস্টার মেশিন থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা জমিতে নামানো যাচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার সিংহভাগই হাওরাঞ্চলে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান জানান, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, "ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে। আমরা কৃষকদের জমির অন্তত ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে দ্রুত তা কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি।" সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

হাওরের অধিকাংশ কৃষকই মহাজন বা এনজিওর কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেন। কৃষক রমজান আলীর মতো অনেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এই আশায় যে, ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে এই দুর্যোগ তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। এখন ঋণ পরিশোধ করা তো দূরের কথা, আগামী এক বছর পরিবারের ১১-১২ জন সদস্যের আহার কীভাবে জুটবে, সেই চিন্তায় তারা দিশাহারা।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) বিজ্ঞানীদের মতে, ভারতের মেঘালয় ও অসমে বৃষ্টিপাত বাড়লে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা ও ধনু নদীর পানি আরও বাড়বে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলের ধান রক্ষায় সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে শ্রমিক ও হারভেস্টার আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। তবে কৃষকদের জন্য এই আশ্বাস যেন আকাশকুসুম কল্পনা। পানির নিচে পচতে থাকা ধান আর পাহাড় সমান ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে হাওরের হাজারো কৃষক এখন শুধু শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। তাদের ঘাম ও শ্রমের ফসল আজ প্রকৃতির গ্রাসে বিলীন হওয়ার পথে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন