ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। গত কিছুদিন দেশের আলোচিত বিষয় এটি। এর মাঝেই বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আগামীকাল শুক্রবার রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন। অবশ্য গণভবনের একটি সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে দেশের আইনে তার পদত্যাগের পর সাময়িক সময়ের জন্য স্পিকারকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্পিকার দেশে না থাকায় রাষ্ট্রপতি পতত্যাগ করছেন না। স্পিকার দেশে ফিরলেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে গেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সূচি অনুযায়ী তার ২৬ তারিখ ফেরার কথা। তবে তার আগেই তিনি ফিরতে পারেন বলে আভাস পেয়েছেন তার দপ্তরের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বৃহস্পতিবার বলেন, পদত্যাগপত্রে এখনো তিনি স্বাক্ষর করেননি। পদত্যগ করলে জানানো হবে।
তবে বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, স্পিকার দেশে না থাকায় চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না রাষ্ট্রপতি। পদত্যাগটা যার কাছে করবেন তিনি নিজেও দেশে নাই। সুতরাং এখন পদত্যাগের সুযোগও নেই। কত লোক কত কিছু বলবে সেটা ধরে থাকলে তো আর চলবে না।
তবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা স্বাস্থ্যগত কারণেই হোক, আর মানসিক কারণেই হোক।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজনও স্পিকারের দেশে না থাকার বিষয়টি সামনে আনলেন। তিনি বলেন, মহামান্য তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি বঙ্গভবনের পাট চুকিয়ে ফেলতে পারেন। স্পিকার ফিরলেই সেটা হতে পারে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আর ৪৮(১) অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে দেশে বা সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে, সংবিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয় বলে পদত্যাগ ও দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সমন্বয় করে এগোনো হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি শিগগিরই পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে পারেন। তবে তিনি এখনও পত্রটি দেখেননি এবং সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরও হয়নি। স্পিকার দেশে ফিরলে বিষয়টি দ্রুত এগোতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে।
শেখ হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠন গত অক্টোবরে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে তুমুল আন্দোলনও শুরু করেছিল। তখন বিএনপি সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা তুলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার আর সে পথে যায়নি।
তবে সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি তখন পদত্যাগ করেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন।
এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির সমর্থনের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে সেই অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষা করাতেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান।
১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতও হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি।
এ কারণে অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
বুধবার হঠাৎ করেই প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।
সায়ের ফেইসবুকে লেখেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
এ বিষয়ে বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনো আসেনি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে সে সুযোগ তার আছে, তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।
স্বাস্থ্যগত কারণেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন কি না, সে প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেটা উনাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
এদিকে একটি গণমাধ্যমে খবর আসে, লন্ডনে চিকিৎসাকালীন রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
অবশ্য বৃহস্পতিবার একাধিক গণমাধ্যমে এমন কথোপকথনের খবর নাকচ করে দেন রাষ্ট্রপতি। একটি গণমাধ্যমকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এটি কল্পনার বাইরে।’
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

