Logo

জাতীয়

২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র বেড়েছে ১৪ লাখ: বিশ্বব্যাংক

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:২২

২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র বেড়েছে ১৪ লাখ: বিশ্বব্যাংক

গত বছর দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে আনুমানিক ১৪ লাখ। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় না বাড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পৌঁছায়নি। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়া, গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সার উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি, পণ্যের দাম ও মানুষের আয়-রোজগারে। সংকট দীর্ঘ হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

যুদ্ধের প্রভাব পণ্যের দামেও পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এতে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দরিদ্র মানুষের ওপর।

তবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতেও বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।

জ্বালানির বাড়তি দামে সরকারের ওপরও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় কমার ঝুঁকি রয়েছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সারসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন ছোট কৃষকরা।

বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণের বেশি। দেশে সার উৎপাদনের জন্যও গ্যাস প্রয়োজন। এরই মধ্যে ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইউরিয়ার দামও বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।

তার মতে, কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বাড়ছে। দেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ছয় হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।

দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আনে। হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট ও জ্বালানির দাম বাড়লে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বাড়তে থাকে।

সব মিলিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের দুর্বল পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হওয়ার পর চলতি বছর দারিদ্র্য কমানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধের প্রভাবে সেটিও এখন পড়েছে বড় ধাক্কার মুখে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন