Logo

জাতীয়

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন- ২০২৬:

এপিবিএনের ক্ষমতা বাড়ছে, জবাবদিহিও কি বাড়বে

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ২০:২২

এপিবিএনের ক্ষমতা বাড়ছে, জবাবদিহিও কি বাড়বে

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব পালনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় ক্ষমতা থাকা যেমন জরুরি, তেমনি সেই ক্ষমতার প্রয়োগও হতে হবে আইনের সীমারেখার মধ্যে। থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে নিরাপত্তা রক্ষার নামে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর সেই কারণেই ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্প্রসারণের বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের আইন প্রয়োগ ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনগত বিষয়।

গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৮তম বৈঠকে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে অনুমোদনটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে। ফলে এখনো এটি সংসদে পাস হয়ে কার্যকর আইনে পরিণত হয়নি।

বিদ্যমান ‘দ্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯’ রহিত করে বাংলায় একটি আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এপিবিএনকে আরও জনবান্ধব ও সময়োপযোগী করাই এর উদ্দেশ্য। খসড়াটি জনমত যাচাইয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।

শুধু নিরাপত্তা নয়, তদন্তের ক্ষমতাও

প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো- এপিবিএনকে শুধু নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তাকারী বাহিনী হিসেবে রাখা হচ্ছে না; ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বিশেষ আদালত ও সংক্ষিপ্ত আদালত গঠনের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, এপিবিএন পুলিশ বাহিনীর অধীনেই থাকবে এবং পুলিশের একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।

জননিরাপত্তা রক্ষা, ভিআইপি ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, সরকার ঘোষিত স্থাপনার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস, মাদক, মানবপাচার, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা- এসব দায়িত্ব এ বাহিনীর ওপর থাকবে।

এসব দায়িত্বের অধিকাংশই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে সন্ত্রাস, মাদক, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে যখন তদন্তের ক্ষমতা যুক্ত হয়, তখন আইনি সুরক্ষা, প্রক্রিয়াগত নিশ্চয়তা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সমানভাবে সামনে আসে।

তদন্তের ক্ষমতায় কতটা সুরক্ষা থাকবে?

একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তির স্বাধীনতা, সুনাম, গোপনীয়তা, সম্পত্তি, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার।

ফলে এপিবিএনের সদস্যদের তদন্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে সেই ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ জরুরি। কোন অপরাধে, কোন পর্যায়ে এবং কোন কর্মকর্তা তদন্ত করতে পারবেন- তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে তদন্তের অনুমোদন কীভাবে হবে, তদন্তকারী কর্মকর্তার যোগ্যতা কী হবে, তদন্তের নথি কীভাবে সংরক্ষণ ও পর্যালোচনা করা হবে এবং অভিযোগকারী ও আসামিপক্ষ কী ধরনের প্রতিকার পাবেন- এসব বিষয়ও আইনের কাঠামোয় থাকা দরকার।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন প্রতিপালন সাপেক্ষে এপিবিএনের সদস্যদের ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হবে।

নীতিগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। তবে শুধু ‘প্রচলিত আইন অনুসরণ’ করার কথা বললেই বাস্তবে জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। আইনের প্রয়োগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করা।

একাধিক সংস্থার তদন্তে এখতিয়ারগত সংঘাতের আশঙ্কা

এপিবিএন পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। ফলে তদন্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের অন্যান্য তদন্ত সংস্থার সঙ্গে এখতিয়ারগত সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

একই ঘটনায় একাধিক সংস্থা তদন্তে যুক্ত হলে তদন্তের স্বচ্ছতা ও সমন্বয় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই কোন সংস্থা কোন ধরনের অপরাধ তদন্ত করবে এবং কোন পরিস্থিতিতে এপিবিএন তদন্তে যুক্ত হবে- এসব বিষয় যতটা সম্ভব আইনেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

শুধু বিধি বা প্রশাসনিক নির্দেশনার ওপর পুরো বিষয়টি ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে এখতিয়ার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ ও সংক্ষিপ্ত আদালত কতটা নিরাপদ?

প্রস্তাবিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দিক হলো বিশেষ আদালত ও সংক্ষিপ্ত আদালত গঠনের প্রস্তাব।

বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া। বিশেষ আদালত বা সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়া নিজেই বেআইনি নয়। আইন প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের আদালত ও দ্রুত বিচারব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।

তবে প্রশ্ন হলো- দ্রুত বিচার যেন ন্যায়বিচারের বিকল্প না হয়ে যায়।

বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, নিরপেক্ষ বিচারক, আপিলের সুযোগ এবং রায়ের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার- এসব মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।

এসব সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দ্রুত বিচারব্যবস্থাই কখনো কখনো ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বিশেষ বা সংক্ষিপ্ত আদালতের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

বিশেষ আদালত মানেই বিশেষ সুবিধা নয়। বরং বিশেষ আদালত হলে তার বিচারিক স্বাধীনতা ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা আরও সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

‘জনবান্ধব’ বাহিনী শুধু আইনে হয় না

সরকার এ আইনকে এপিবিএনকে আরও ‘জনবান্ধব’ করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। উদ্দেশ্যটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।

কিন্তু জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু আইনের নাম বা দায়িত্বের তালিকা পরিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না।

এর জন্য প্রয়োজন আচরণগত সংস্কার, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক তদন্ত পদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ সংগ্রহ, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং নাগরিক অভিযোগের কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা।

এপিবিএনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যদি অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকি জোরদার করা হয়, তাহলে নতুন আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যথায় ক্ষমতার বিস্তার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ থেকে আধুনিক আইনে

১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময়কার সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও অপরাধের ধরন আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে এক নয়।

সাইবার অপরাধ, আন্তঃদেশীয় মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, সংগঠিত অপরাধ এবং সন্ত্রাসের নতুন ধরন- সব মিলিয়ে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর দায়িত্বও বদলেছে।

তাই পুরোনো অধ্যাদেশকে যুগোপযোগী করে একটি বাংলা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সময়ের দাবি।

তবে আইন বাংলায় প্রণীত হলেই তা আধুনিক হয়ে যায় না। আধুনিক আইন মানে হলো- পরিষ্কার সংজ্ঞা, সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা, ক্ষমতার সীমা, জবাবদিহির ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার কার্যকর নিশ্চয়তা।

প্রস্তাবিত আইনে বিদ্যমান অধ্যাদেশ রহিত করার পাশাপাশি সেই অধ্যাদেশের অধীনে সম্পন্ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিধান রাখা হয়েছে।

প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার জন্য এটি প্রয়োজনীয় হলেও, অতীতের কোনো কার্যক্রম আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার প্রতিকার বা বিচারিক পর্যালোচনার পথ যাতে বন্ধ না হয়, সেটিও স্পষ্ট থাকা জরুরি।

জনমতকে গুরুত্ব দেওয়াই এখন বড় পরীক্ষা

আইনের খসড়া জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে- এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

এখন প্রয়োজন সত্যিকার অর্থে সেই জনমতকে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা।

আইনজীবী, বিচারক, অপরাধবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী, সাবেক আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

বিশেষ করে তদন্ত ক্ষমতা এবং বিশেষ ও সংক্ষিপ্ত আদালত সংক্রান্ত বিধান নিয়ে বিস্তারিত আইনগত পর্যালোচনা প্রয়োজন।

কারণ একটি বাহিনীকে ক্ষমতা দেওয়া যতটা সহজ, সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর কার্যকর কাঠামো তৈরি করা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা চাই, তবে আইনের বাইরে নয়

রাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা- দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুর্বল রেখে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। আবার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হয়।

‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’ সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ হতে পারে।

এপিবিএনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তদন্তের মান, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিচারিক তদারকি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা গেলে আইনটি জননিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এপিবিএনের ক্ষমতা কতটা বাড়বে- তা নয়; বরং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক হবে, সেটিই হয়ে উঠবে নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন