Logo

জাতীয়

গুম প্রতিরোধে বদ্ধপরিকর সরকার

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০৩

গুম প্রতিরোধে বদ্ধপরিকর সরকার

ছবি: সংগৃহীত

‘সবার আগে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে (আইসিপিপিইডি) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে উদযাপিত এ দিবসটি দেশের মানবাধিকার ও রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন বার্তা বহন করে। বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিরোধী মত দমন, দমনপীড়ন ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর মাধ্যমে সৃষ্ট আতঙ্কের পরিবেশের বিপরীতে বর্তমান সরকার দেশে আর কোনো গুম বা গোপন বন্দিশালা না থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও বিচারের মুখোমুখি করার ঘোষণা দেন এবং গুমের শিকার পরিবারগুলোর শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপি সরকারের আমলে ভবিষ্যতে কাউকে গুম হতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি গুমের শিকার ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আশ্বস্ত করেন।

অনুষ্ঠানে ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনাসহ ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা ও নির্মম বাস্তবতা। তবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ মহলের এই আশ্বাসের পাশাপাশি গুম প্রতিরোধে প্রস্তাবিত আইন ও বিচারিক কাঠামো নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত এক হাজার ৫৬৯টিরও বেশি গুমের ঘটনা নিয়ে গঠিত কমিশনের অনুসন্ধানে র‌্যাব, ডিবি, ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর মতো সংস্থার যুক্ততার প্রমাণ মিললেও, সম্প্রতি সংসদে উত্থাপিত নতুন বিল থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বাদ দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধী দলের সংসদ ওয়াকআউটের ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করে গুম কমিশনের সুপারিশমালার আলোকে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের দাবি জানিয়েছে। একদিকে স্বজনদের বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আকুতি, অন্যদিকে আইনটির সর্বজনীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ- এই দুই বাস্তবতার মুখেই পালিত হলো এবারের গুম প্রতিরোধ দিবস।

দেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না-রাষ্ট্রপতি: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তিনি বলেন, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটা পবিত্র দায়িত্ব গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’

বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল বলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখনই আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম-খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ সময় তিনি বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে গুমের শিকার ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদের স্মরণ করেন।

এ সময় তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না।

রাষ্ট্রপতি গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ফ্যাসিবাদী আমলে গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা সানজিদা ইসলাম তুলির কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার হওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং গুমের ঘটনাগুলোর যথাযথ বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

কাউকে গুম করেনি সরকার, ভবিষ্যতেও করতে দেবে না-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএনপি সরকার কাউকে গুম করেনি এবং ভবিষ্যতেও কাউকে গুম করতে দেবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নতুন গুমবিরোধী আইনের মাধ্যমে দেশে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

রোববার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম দিবসের আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের ঘটনায় শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। বরং জুলাইয়ের ঘটনাকে ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এটিকে তিনি বিশ্বব্যাপী লজ্জাজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও বিচার নিশ্চিত করা হবে।

নিজে গুমের শিকার হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নিজে গুমের শিকার হওয়ার পর এই আইন দুর্বল হোক, সেটা কী চাইতে পারি?’ তিনি বলেন, বিএনপি সরকার কাউকে গুম করেনি এবং ভবিষ্যতেও কাউকে গুম করতে দেবে না।

বিরোধী দলের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন ও ওয়াকআউটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওয়াকআউট কোনো সমাধান নয়। বরং সব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। কোনো কিছু না বলে বা না শুনে ওয়াকআউট করলে জাতি তাদের বক্তব্য থেকে বঞ্চিত হবে।

জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আগের তুলনায় গুমবিরোধী আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। গুমের শিকার ব্যক্তিরা মামলা করলে সরকার তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেও জানান তিনি।

বাবা গুম শুনতে শুনতেই পরীক্ষার হলে যায় ছেলে: ‘আমার স্বামী যখন গুম হয়, আমার বড় ছেলের তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল। ১৭ এপ্রিলের পরদিন ১৮ তারিখ ওর কেমিস্ট্রি পরীক্ষা ছিল। আমি তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। যেহেতু তার প্রিপারেশন ছিল, সেই অবস্থাতেও আমি সঙ্গে করে তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। যখন ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়িয়েছে, তখন পত্রিকা বিক্রি করছিল (হকার)- ইলিয়াস আলী গুম, ইলিয়াস আলী গুম। সেই কথাটা শুনতে শুনতে আমার ছেলে পরীক্ষার হলে গিয়েছে।’

এভাবেই ইলিয়াস আলীর গুমের সময়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা।

গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় নিজের পরিবারের সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।

তাহসিনা রুশদীর লুনা আরও বলেন, ‘আমার ছোট মেয়েটা, সে স্কুলে গেলে তাকে মানুষ প্রশ্ন করতো, তোমার বাবার খবর...। কেউ হাসাহাসিও করেছে। সেটা নিয়ে আমার ছোট মেয়েটাকে স্কুল বদলাতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাকে মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসা বন্ধ করে দেই। মানুষ যেন তাদের না চেনে, তাদের বড় হওয়া সেগুলো একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।’

এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘তারপরও আমরা শুধু আজকের যে গুম দিবস সেটা নয়, আমার মনে হয় যতদিন আমরা বেঁচে থাকবো ততদিন আমাদের এটাকে ক্যারি করতে হবে যে আমরা কোন পরিবারের সদস্য বা আমাদের পরিবারের কেউ গুম হয়েছে।’

সংসদ অভিমুখে ১১ দলের পদযাত্রা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের দাবি: আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের উদ্যোগে রাজধানী ঢাকায় সংসদ ভবন অভিমুখে এক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুম কমিশনের সুপারিশমালার আলোকে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানসহ একাধিক দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।   

রোববার বিকাল পৌনে ৪টার দিকে ‘বাংলাদেশ গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি’-র ব্যানারে রাজধানীর বাংলামোটর এলাকা থেকে এই পদযাত্রা শুরু করেন জোটের শীর্ষ নেতাকর্মীরা। পদযাত্রাটি সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। যেখান থেকে একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি প্রদান করে।

স্মারকলিপিতে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশসমূহ কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়া হুবহু আইনে পরিণত করা এবং বিগত সময়ে গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়।

পদযাত্রায় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

এর আগে বিকেল ৩টার দিকে বাংলামোটরের রূপায়ন ট্রেড সেন্টারের সামনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরের দাবি জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের শুরু থেকে গুমের ঘটনা সামনে আসতে থাকে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, ২০০৯ সালে দলটি ক্ষমতায় আসার বছরেই ১০টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়; ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৩৪টি। ওই বছরের ২৫ জুন বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলম নিখোঁজ হলে রাজনৈতিক গুমের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৩-১৪ সালের দিকে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে। ভুক্তভোগীদের বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২২ দিন পর, ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনের দায়িত্ব ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের অভিযোগ অনুসন্ধান করা। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনায় নেয়।

এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত বেআইনি ও গোপন আটকের পর ফিরে এসেছেন। ২৫১ জন আর ফেরেননি। আরও ৩৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। বাস্তবে গুমের ঘটনা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলেও কমিশন ধারণা দিয়েছে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৫০টি ঘটনায় ঘটনার নথিগত প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিগুলোর নথিগত প্রমাণ না থাকার মূল কারণ থানায় জিডি গ্রহণ না করা।

কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, র‌্যাব, পুলিশ, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবি ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর পাশাপাশি ডিজিএফআই, এনএসআইসহ অন্য সংস্থার সংশ্লিষ্টতাও উঠে এসেছে।

গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যুক্ত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। পরের জানুয়ারিতে এতে সংশোধনী আনা হয়।

অধ্যাদেশে বিচারের জন্য বিশেষ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার ট্রাইব্যুনালের বিধান ছিল। কমিশনের প্রতিবছর গুমের পরিসংখ্যান, ধরন ও সুপারিশ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও ছিল।

পরে অধ্যাদেশটি সংসদে বিল হিসেবে এনে অনুমোদন করা হয়নি। সাংবিধানিক সময়সীমা ১০ এপ্রিল শেষ হওয়ায় ১১ এপ্রিল থেকে সেটি কার্যকারিতা হারায়। তখন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও সমৃদ্ধ ও ভালো আইন করবেন তারা।

অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারানোর পর ২৭ জুলাই আইনের নতুন খসড়া প্রকাশ করে বিএনপি সরকার। ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয় এবং ২৭ আগস্ট বিলটি সংসদে তোলা হয়। তবে বিলটি উত্থাপনের আগেই বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বদলে সরকার পৃথকভাবে ‘খণ্ডিত’ সংস্কার করছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের দুই সদস্যের কারিগরি প্রতিনিধিদল ২০২৫ সালের ১৫ থেকে ১৮ জুন বাংলাদেশ সফর করে। সরকার, গুম তদন্ত কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বৈঠকের পর তারা স্বাধীন নজরদারি ও দায়মুক্তি বন্ধের সুপারিশ দেয়। এরপর ২০২৬ সালের ১৭ জুন জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ পাঠান।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা আর অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত এক বিষয় নয়। গুমের খবর পাওয়া মাত্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার অপেক্ষা না করে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত। ব্যক্তির ভাগ্য ও অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তা চালাতে হবে। পরিবারেরও সেই অনুসন্ধানে অংশগ্রহণের অধিকার থাকা উচিত।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন