জ্বালানি সংকট কাটাতে আসছে সমন্বিত পরিকল্পনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৩৫
ছবি: সংগৃহীত
ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও তীব্র বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জোড়া চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে ১০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান এবং ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) রূপান্তর কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য ঘোষণা করে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকট কাটাতে পাঁচ দফা কর্ম-পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন— যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণ, পিএসসি ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
এছাড়া, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত প্রসারে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের থেকে ১০ দশমিক ৫০ টাকা হারে বিদ্যুৎ কেনার আকর্ষণীয় ঘোষণা এবং শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ বিদ্যুৎ না পাওয়ার মতো জটিলতায় যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতির আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
যদিও বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ, এলএনজি ও তেল-কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনা দূর করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
জ্বালানি সংকট কাটাতে ৫ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে-প্রধানমন্ত্রী: দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই পাঁচ কর্মপরিকল্পনা হলো— দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণ, প্রোডাশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই কর্ম-পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
অধিবেশনের শুরুতে আধা ঘণ্টা সময় নির্ধারিত ছিল প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই পর্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য লিখিত প্রশ্ন ছিল আটটি। আধা ঘণ্টা সময়ে চারটি লিখিত প্রশ্ন এবং ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান সাতটি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার টুডি সাইসমিক সার্ভে এবং চার ২০০ বর্গ কিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে তথ্য দেন সরকার প্রধান।
প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট বা পিএসসি ও বিডিং প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে এই টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে আশা করছি। ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
সংরক্ষিত আসনের আরেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্য যেমন- সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপ করা কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করবেন তাদের সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ দশমিক ৫০ টাকা করে কিনবে বলেও তথ্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাল্ক রেটের অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে দেবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ছয়-সাত টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০ শতাংশ মুনাফা ও পাঁচ শতাংশ প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থাসমূহকে ইতোমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি উক্ত কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকার আগামী দশ বছর কি কি করবে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যতটুকু আমার ধারণা আছে, দ্রুতই সংসদের সামনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী উপস্থাপন করবেন দেশের সামনে, আগামী দশ বছর কীভাবে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সাজানোর চেষ্টা করছি। যাতে করে আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে টার্গেট করেছি, সেটা অর্জন করতে সক্ষম হই।
সংরক্ষিত আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য যে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন, অবশ্যই আমরা দেশে যেই সমস্যাটি আছে জ্বালানির, এটিকে সমাধান করতে চাইছি। ফুলবাড়ীতে যে কয়লার কথা উনি বলেছেন, সেই কয়লা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কয়লার মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লাটিকে উত্তোলন করে যদি আমাদের জ্বালানি সংকট মেটাতে পারি, অবশ্যই সেটা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা যেরকম সাশ্রয় করবে, একইভাবে দেশের জন্য সেটি ভালো হবে। অবশ্যই কয়লাটি উত্তোলন করতে গেলে ওপেন পিট যদি করতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কিছু বসতবাড়ি আছে। সেখানে কৃষি জমি আছে। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য; অবশ্যই সবচেয়ে আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে সেই মানুষগুলোকে আগে সেটেলমেন্ট করা যায়। তাদের যাতে আয় রোজগার বন্ধ না হয় বরং সেই প্রকল্প গ্রহণ করলে যাতে তারা কোনো না কোনোভাবে লাভবান হতে পারে, সে সব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেই এবং অবশ্যই পরিবেশের যে বিষয়টি আছে সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে-সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী: আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে মানুষ যে দুর্ভোগে পড়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
সংসদে দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দলের সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকাতে চাই না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহের কারণে কষ্টে আছে।’
বর্তমান সংকটকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট নতুন করে চাপ তৈরি করেছে বলেও জানান তিনি।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও গৃহস্থালি—এই তিন খাতে ভারসাম্য রেখে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকাকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে।
ভারতের আদানি গ্রুপ থেকেও চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। চুক্তি অনুযায়ী এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এ ছাড়া আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে ব্যবহৃত দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় রুফটপ সোলারসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। সরকারের নতুন রুফটপ সোলার নীতির ফলে আগামী গ্রীষ্মে চলতি সময়ের মতো বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংসদ সদস্যদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের প্রকৃত তথ্য জানানো এবং এ খাত নিয়ে থাকা ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করবে সরকার।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট নানামুখী: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটের সমাধান আছে। সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, এ বিষয়ে পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে। লোডশেডিং কোনো কোনো দিন সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন করা যাচ্ছে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কম। দেশে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কয়লা থেকে। বকেয়া বিলের কারণে কয়লা আমদানি ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারিগরি ত্রুটি।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে সরকার অন্তত চার মাস স্বস্তিতে থাকবে। কিন্তু পরের গ্রীষ্মের জন্য এ সময়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। এখনই মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। মধ্যমেয়াদে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দিতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ দরকার।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা: পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের ঘাটতি দেখেন। তিনি বলেন, সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি কর্মসূচি দিচ্ছে কিন্তু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। যেকোনো একটা ক্রাইসিসে যে কোনো একটা খাতকে তিনটা প্রোগ্রাম নিতে হয়। একটা ক্রাশ প্রোগ্রাম, একটা মিডটার্ম প্রোগ্রাম এবং একটা লংটার্ম। ক্রাশ প্রোগ্রামটা কী তাদের এখনো জানে না। অনেকের সঙ্গে আমি আলাপ করি তারা কোনো আইডিয়া করতে পারতেছে না কীভাবে ইমিডিয়েটলি এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে মুক্তি দেওয়া যাবে। যারা এখানে বসে আছে পাওয়ার সেল আছে, বিদ্যুৎ বোর্ড আছে, অন্যান্য সংস্থা আছে বিদ্যুৎ মন্ত্রী স্বয়ং এখানে ছিলেন। এই ক্রাশ প্রোগ্রামটা কী হবে এইটা তারা জানে না।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নিয়মিত বিল দিয়ে তেল আমদানি করতে বলা হচ্ছে। তেল পেতেও একটু সমস্যা হচ্ছে। সবারই নজর এখন সিঙ্গাপুরের বাজারে।
স্বল্পমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, এলএনজির দাম অনেক বেশি, কেনাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবু কিনতে হবে। তবে আগের মতো সরবরাহ করা সম্ভব না-ও হতে পারে, কিছু ঘাটতি থাকবে। অগ্রাধিকার চাহিদা বুঝে সরবরাহ করতে হবে। আর তেল ও কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত মূল্যায়ন করে তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, ছয় মাস কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত সময় নয়। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আছে বলেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার ছয় মাসে যে লক্ষণগুলো দেখাচ্ছে এর একটা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনো মনোযোগ আমরা দেখি নাই। গতিমুখ পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা আমরা দেখি নাই। এবং সংকটকে যথাযথভাবে শনাক্ত করে সেখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা বের করার সেটার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দেখতে পারছি না। আমরা উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি বরঞ্চ দেশি বিদেশি কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যবসা বাড়ানোর ব্যাপারে তাদের আগ্রহ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

