Logo

জাতীয়

পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০৪

পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং দেশের অভ্যন্তর ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের পাঁচটি জেলা— চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা এবং সিলেটের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের ১০৯টি গেট খুলে দেওয়া এবং সেখান থেকে প্রায় ১৬ লাখ কিউসেক পানিপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশের সীমানায় পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতে ঢলের পানি হু হু করে প্রবেশ করছে। এর সরাসরি প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের শতাধিক বাড়িঘরে ইতোমধ্যেই পানি ঢুকে পড়েছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকার আউশ ধানখেত তলিয়ে গেছে। 

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষকদের মতে, ফারাক্কার উপচেপড়া পানির কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীসহ গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার চরাঞ্চলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতিতে নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলোতে জরুরি নজরদারি বাড়ানো ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পাউবোর সতর্কতা: নদ-নদীর পানি বাড়ায় দেশের পাঁচটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। বৃহস্পতিবার এমন তথ্য জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

পাউবো জানিয়েছে, পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিন দেশের অভ্যন্তরে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজান এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকা ও সংলগ্ন এলাকায় মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল রয়েছে, যা আগামী পাঁচ দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। অপরদিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির সমতল বেড়েছে।

গঙ্গা নদীর পানি সমতল আগামী এক দিন বৃদ্ধি ও দ্বিতীয় দিন স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী তিন দিন হ্রাস পেতে পারে।

এ ছাড়া পদ্মা নদীর পানির সমতল আগামী দুদিন বৃদ্ধি পেতে পারে ও পরবর্তী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে।

আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় গঙ্গা নদী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সামরিকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় গড়াই ও মাথাভাঙা নদীর পানির সমতল বেড়েছে, যা আগামী দুদিন বৃদ্ধি পেতে পারে ও তৃতীয় দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে।

আগামী ২৪-৭২ ঘণ্টায় গড়াই নদী ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও মাগুরা জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

এ ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানির সমতল বেড়েছে। উক্ত নদীগুলোর পানির সমতল আগামী তিন দিন বাড়তে পারে। আগামী ২৪-৭২ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদী সিলেট জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

উত্তরাঞ্চলীয় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল রয়েছে। তিস্তা নদীর পানির সমতল আগামী এক দিন বৃদ্ধি পেতে পারে ও পরবর্তী দুদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। অপরদিকে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানির সমতল আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হু হু করে বাড়ছে তিন নদীর পানি, ডুবছে নিম্নাঞ্চল: উজানে ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করেছে। এসব নদীর পানি এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বৃহস্পতিবার পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার, মহানন্দা নদীর পানি বিপৎসীমার এক দশমিক ৩২ মিটার এবং পুনর্ভবা নদীর পানি দুই দশমিক ৩২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে জানয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন জানান, পদ্মা নদীতে ব্যাপক হারে পানি বাড়ছে। এখন পর্যন্ত কোনো বাড়িঘরে ও রাস্তায় পানি ঢোকেনি, তবে কয়েকটি জায়গায় নদীভাঙন চলছে। এমনভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম বলেন, এখন পর্যন্ত বাড়িঘরে পানি না ঢুকলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দুই-তিন দিনের মধ্যে তার ইউনিয়নের ৪ নম্বর ও ৬, ৭, ৮ এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিম্নাঞ্চলে পানি এসে যাবে। তবে নিম্নাঞ্চলের কিছু পাকা আউশ ধানখেত নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকরা এসব এলাকার ধান কেটে ঘরে তুলছেন।

এদিকে, একই উপজেলার পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পদ্মায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তার ইউনিয়নের চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর, নতুনপাড়া এলাকায় অন্তত ১০০টি বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, উজানে ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার নদীগুলোর পানি বাড়ছে। তবে দুই দিন পানি বাড়ার পর আবার কমতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বন্যার শঙ্কার কথা জানালেন আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ: পদ্মা নদীর চর ও নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ।

বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, পদ্মা নদীর পানি বন্যা বিপৎসীমার কাছাকাছি উচ্চতায় প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

মোস্তফা কামাল পলাশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য তথ্যে ফারাক্কায় গঙ্গার পানির উচ্চতা ২৩ দশমিক ৭৫ মিটারে পৌঁছেছে। সেখানে স্থানীয় বিপৎসীমা ২২ দশমিক ২৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার প্রায় ১ দশমিক ৫০ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ব্যারাজের ১০৯টি গেটই খোলা রয়েছে। সেখানে মোট পানিপ্রবাহ প্রায় ১৬ লাখ কিউসেক। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি ফিডার খাল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

একই সময়ে ভারতের মুর্শিদাবাদের কয়েকটি নদী তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। ফারাক্কা থেকে আসা বাড়তি পানির প্রবাহের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে।

মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, বর্তমান হারে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী এক থেকে দুদিনের মধ্যে আরও চরাঞ্চল ও বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করতে পারে। এ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর চরাঞ্চল এবং নিচু নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি নজরদারি প্রয়োজন।

পানি বৃদ্ধির কারণে এসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নদী ও চরাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন