# র্যাবের বিলুপ্তি গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
# এসআরবি পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন এলিট ফোর্স স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) সভাপতিত্বে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই বিলটি পাস হয়।
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আইন পাসের কার্যক্রম শুরু হলে বিলটি পাসের আগে স্পিকার বলেন, আমরা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল ২০২৬ পাসের স্তরে রয়েছি। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল ২০২৬ অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট চান স্পিকার। এ সময় কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। পরবর্তীতে বিলের দফায় সংশোধনী নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
র্যাবের বিলুপ্তি গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
র্যাব বিলুপ্ত করা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাস হলে র্যাব নামে আর কোনো বাহিনীর অস্তিত্ব থাকবে না। এর পরিবর্তে নতুন বাহিনী হিসেবে এসআরবি কার্যকর হবে। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে এসআরবি বিলের ওপর জনমত যাচাই-বাছাই ও বিরোধীদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করা আমাদের ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল। এটি আমাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিও ছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও র্যাব বিলুপ্তির কথা বলেছিলেন। বিলটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাবের নাম ও অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে এবং নতুন বাহিনী এসআরবি গঠিত হবে।
র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ নিলামে দিয়ে দেওয়া হবে না। র্যাবের কাছে থাকা অস্ত্রশস্ত্র, গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ অন্যান্য সম্পদ রাষ্ট্রেরই সম্পদ। নতুন সংস্থা গঠনের পর এসব সম্পদ কাজে লাগানো হলে নতুন করে একই ধরনের সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজন হবে না। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক অপচয় রোধ হবে।
বিলটি দ্রুত পাস করা হচ্ছে এবং বিরোধীদের যথেষ্ট পরামর্শ নেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও নাকচ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক চার কার্যদিবস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিলটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর আগেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিলটি পাস হতে যত বিলম্ব হবে, র্যাব কিন্তু ঠিকই রয়ে যাবে। বিরোধী দলের সদস্যরা কি সেটাই চান?
এসআরবি সদস্যদের দায়িত্ব ও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত আইনে প্রতিটি ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর অনতিবিলম্বে তাকে এবং উদ্ধার করা আলামত নিকটবর্তী থানার হেফাজতে হস্তান্তর করতে হবে।
এসআরবির অভ্যন্তরীণ অভিযোগ প্রতিকার কমিটিতে হাইকোর্টের বিচারপতি রাখার বিরোধীদের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়। এক্ষেত্রে হাইকোর্টের বিচারপতিকে প্রধান করার সুযোগ নেই। তবে কোনো সদস্য ফৌজদারি অপরাধ করলে প্রস্তাবিত আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে।
বর্তমান সময়ের অপরাধ মোকাবিলায় নতুন বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধের ধরনও বদলেছে। বর্তমানে প্রায় সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে সাইবার স্পেসের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই সাইবার অপরাধ দমনে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে সংশোধনী আনার পাশাপাশি পুলিশের অধীনে ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ নামে নতুন একটি ইউনিট গঠন করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে র্যাব ২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধন) আইনের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এসআরবি বিলের পাশাপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬ ইতোমধ্যে সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, এসআরবি পুলিশ বাহিনীর অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। নিয়োগ বা প্রেষণের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিত সশস্ত্র সদস্য বা কর্মচারীদের নিয়ে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটটির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও পোশাক থাকবে। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক করা হবে।
এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। এছাড়া ইউনিটটির নিজস্ব হাজত, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র থাকবে। জনসাধারণের অভিযোগ এবং এসআরবি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করা হবে।
পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে গতিশীল ও কার্যকর করতে ২০০১-০৬ মেয়াদে তৎকালীন বিএনপি সরকার একটি এলিট ফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করে। পরে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস প্যারেডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে র্যাব আত্মপ্রকাশ করে। একই বছরের ২১ জুন থেকে র্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
দুই দশক আগে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের কাজে গঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর আসে। মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকরাও এই বাহিনীকে ‘সরকারি ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত সাত খুন মামলা থেকে শুরু করে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়া পর্যন্ত নানা ঘটনায় বাহিনীটি বেশ কুখ্যাতি অর্জন করে। এর মধ্যেই মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর বিভিন্ন সময়ে র্যাবে দায়িত্বপালনকারী ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। এত কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে বছরের পর বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন র্যাব সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এই দাবি আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনা তদন্তে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিশনের কাছে র্যাবের বিরুদ্ধে গুমের ১৭২টি অভিযোগ জমা পড়ে, যা যেকোনো বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। এরপর বিএনপি সরকার গঠনের পর র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন সংস্থা গঠনে গত ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলে র্যাব গঠনের আইনি বিধানগুলো বাতিল করে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে এসআরবি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়।
সেদিন মন্ত্রী বলেছিলেন, এসআরবিতে র্যাবের তুলনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী বিধান থাকবে। সংসদে আলোচনার পর বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। এরপর গত মঙ্গলবার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ সংশোধিত আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করে স্থায়ী কমিটি।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

