জেলা পর্যায়েও সাইবার ইউনিট গঠন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৭
# অপরাধীর দ্রুত জামিন ঠেকাতে নতুন আইন প্রয়োজন
# জুয়া ও মাদক অনেক অপরাধের মূল কারণ
# সাংবাদিকদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান
অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে সরকার দেশজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশ সদর দপ্তর ও মহানগর থেকে শুরু করে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও প্রয়োজনীয় ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উপজেলা ও থানা পর্যায়েও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অপরাধীদের দ্রুত জামিন ঠেকাতে নতুন আইন প্রয়োজন জানিয়ে অপরাধ দমনে সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ এখন আর শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে সংঘটিত হচ্ছে না। মাদক, জুয়া, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিংসহ বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, আর্থিক লেনদেন ও সাইবার স্পেসের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শুধু লোকেশন শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। টেলিফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ তদন্ত ও অভিযোগপত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সরকার পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত ইউনিটের পাশাপাশি বিভাগীয় সদর দপ্তরগুলোতেও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়েও এসব ইউনিট গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট থাকবে। উপজেলা বা থানা পর্যায়ে এক-দুজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সহযোগিতা নেবেন। এই কাঠামোর মাধ্যমে দেশীয় অপরাধের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে জানান তিনি।
মাদক অপরাধ মোকাবিলায় পৃথক ও বিশেষায়িত পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মাদকদ্রব্যের রাসায়নিক পরীক্ষা ও ফরেনসিক কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু ঘটনা ঘটার পর গ্রেপ্তার ও শাস্তির ব্যবস্থা না করে অপরাধের মূল কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধ হওয়ার পর পুলিশ গ্রেপ্তার করবে, বিচার হবে এবং সাজা হবে—শুধু এভাবে অপরাধ দমন করা যায় না। কেন অপরাধ হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে হবে। অপরাধের উৎসে সমাধান করতে পারলেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মাদক ও জুয়াকে বিভিন্ন অপরাধের অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত অনেকের মাদকাসক্তি বা জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। মাদক বা জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েও কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় আইনেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লেনদেন ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে জুয়ার বিস্তার ঘটলেও পুরোনো আইনে এসব অপরাধ মোকাবিলা করা কঠিন।
নতুন আইনে অনলাইন ও সাইবার স্পেসে জুয়া, সংঘবদ্ধভাবে জুয়া পরিচালনা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং ম্যাচ ফিক্সিংসহ বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সমাজের চাহিদা সময়ের সঙ্গে বদলায়। সে অনুযায়ী আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করতে হয়। আইন দুর্বল হলে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
ক্রাইম রিপোর্টিংকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধের ধরন জটিল ও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠায় ক্রাইম রিপোর্টারদের প্রযুক্তি, আইন ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে হবে।
সাইবার স্ক্যাম বা আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো ঘটনায় একাধিক দেশ বা বিদেশি অপরাধচক্র যুক্ত থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্রাইম রিপোর্টারদের ঝুঁকিতে পড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকদের সরাসরি ঝুঁকি ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিকল্পভাবে সহায়তার সুযোগ খোঁজা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ঝুঁকি নিয়ে ক্রাইম রিপোর্টিং করতে গিয়ে কেউ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা সরকার দেখবে। প্রয়োজনে অন্য কোনো তহবিল বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) মাধ্যমেও সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সনদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও আইনগত ও প্রশাসনিক দিক পর্যালোচনা করে দেখার কথা জানান তিনি।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ক্রাইম বিটের সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু অপরাধের ঘটনা প্রকাশ নয়, এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানেও মনোযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও সমাজ সমন্বিতভাবে কাজ করলে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

