# মিলতে পারে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
# পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর হবে কূপ
# গভীর স্তরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা
# এলএনজি আমদানির চাপ কমাতে পারে দেশীয় গ্যাস
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে খনন করা হচ্ছে নতুন তিনটি কূপ। যার একটি দেশের প্রথম এবং সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। নতুন এসব কূপ থেকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের আশা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) কর্তৃপক্ষের।
এর মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি জ্বালানি সংকট নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনটি কূপ থেকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় চলছে ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ। কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর করার লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার খনন সম্পন্ন হয়েছে।
পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর হবে কূপ: চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ৩১ নম্বর কূপের খনন শুরু হয়। এর আগে তিতাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। এবার সেই সীমা ছাড়িয়ে গভীর স্তরে গ্যাসের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, আমি আশা করছি যে আমরা যদি খনন কাজটা সাকসেসফুলি কমপ্লিট করতে পারি, তাহলে অন এভারেজ এই তিনটা কূপ থেকে হয়তো ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস এই তিনটা কূপ থেকে দেওয়া সম্ভব হবে। ২৯ নম্বর কূপটা খনন সম্পন্ন হলে ৩০ নম্বর কূপটা আমরা খননে যাব। একই রিগ দিয়ে ৩০ নম্বর কূপ খনন হবে।
তিনি জানান, ২৯ নম্বর কূপটা যেহেতু ২৮৬০ মিটার খনন হয়েছে, এটা যদি কোনো কারিগরি জটিলতা না থাকে হয়তো আগামী দুই মাসের মধ্যে হয়ে যাবে। এবং ঐটা শেষ হয়ে গেলে তারপরে হয়তো ৩০ হবে। আর আমার ৩১ নম্বর কূপ আরো তিন থেকে চার মাস লাগবে। কারণ এটার সাথে যেহেতু অনেক গভীর এবং হাই প্রেশার টেম্পারেচার খননকালীন সময়ে কিছু জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছি বা ভবিষ্যতে আবার কী হব এটাও বলা যায় না। তবে আমাদের প্রেডিকশন যে এই তিনটা কূপ হয়তো আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।
প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, বাংলাদেশে আমরা তিতাসে এ পর্যন্ত আমরা ৩৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করেছি। কিন্তু ৩৭০০ মিটারের নিচে কী আছে এটা আমরা জানি না। বাট আমরা এই ৩৭০০ মিটার যখন ১৯৬৯ সালে এই ৩৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত যায়, তখন কিন্তু ৩৬০০ মিটারে একটা হাই প্রেশার জোন এনকাউন্টার করে। এই কারণে কিন্তু আমাদের নিচে যাওয়া হয় নাই। এখন দেশে যেহেতু একটা জ্বালানি সংকট এবং আমাদের মন্ত্রণালয় বলেন, পেট্রোবাংলা বলেন এবং আমাদের হায়ার অথরিটি যারা আছে, তারা আসলে গভীরতম স্তরে কী আছে এটা আমাদেরও আইডেন্টিফাই করার একটা বিষয় আছে।
সেই কারণে আমরা এই কূপটার বিশেষত্ব হলো, এটা হচ্ছে একটা গভীর অনুসন্ধান কূপ এবং যেটা হাই প্রেশার হাই টেম্পারেচার বিভিন্ন জোন অতিক্রম করে যাবে। এবং তিতাসের ৩৭০০ মিটার এর থেকে ৫৬০০ মিটার গভীরে আরও কোনো গ্যাসের উপস্থিতি আছে কিনা এটা জানা যাবে। তো এই মুহুর্তে আমাদের যে টার্গেটটা আছে, মানে সিসমিক স্টাডির ওপরে ভিত্তি করে যে এখানে ২ টিসিএফ এর মতো গ্যাস থাকতে পারে। এই উদ্দেশ্যেই আমরা এই খননটা সম্পন্ন করা।
তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন বাড়াতে বন্ধ কূপ ওয়ার্কওভার এবং নতুন আরও কূপ খনন প্রকল্প গ্রহণের কথা জানান বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
গভীর স্তরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা: সিসমিক জরিপের ভিত্তিতে তিতাসের গভীর স্তরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, তিতাসে আগে ৩ হাজার ৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরে উচ্চচাপের একটি জোন পাওয়া যায়। সে কারণে তখন আরও গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খননের মাধ্যমে ওই গভীর স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন গ্যাসের মজুত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এলএনজি আমদানির চাপ কমাতে পারে দেশীয় গ্যাস: বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে তিন কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, এই গ্যাস দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুব বেশি না হলেও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশীয় গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির খরচ অনেক বেশি। ফলে নতুন কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কূপে ওয়ার্কওভার এবং নতুন কূপ খননের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ইতিহাস: ১৯৬২ সালে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি। এরপর ১৯৬৮ সালে এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্র।
নতুন তিনটি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হলে তিতাসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

