শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৩৫
# ১০২ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা
# বেতন-ভাতার অর্থ সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়ার নির্দেশ
# কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না
# শিক্ষকতা প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে
# পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবার সাশ্রয়ী আবাসনের অঙ্গীকার
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম একটি সমাজ গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি শিক্ষকদের বিকল্প না হয়ে তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ বছর ‘শিক্ষকদের পাশে থাকা, পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের এই সম্মাননা দেন।
জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে দুপুর ২টায় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য ও অতিথিদের আলোচনা শেষে নির্বাচিত শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেওয়া হয়।
এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উপলক্ষে সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, পারিবারিক পরিবেশের গণ্ডি পেরিয়ে আসার পর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকরা হয়ে ওঠেন আদর্শ রোল মডেল। শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হওয়া উচিত বলেও তিনি গুরুত্ব দেন।
পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বিকল্পহীন হয়ে উঠেছে। তাই শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তন এবং শিক্ষা পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন সময়ের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সরকার নতুন একটি পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বছর শিক্ষার্থীরা এর ভিত্তিতে তৈরি পাঠ্যবই পাবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এ ধরনের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা উচিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে শিক্ষা খাত একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। পরিবর্তিত শিক্ষার চাহিদা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তিকে শিক্ষকদের বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না। বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকদের শক্তি।’
শিক্ষকরা যাতে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের জন্য ট্যাবলেট ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য সরকার ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ও বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগও সরকার নিচ্ছে।
কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না: তারেক রহমান জানান, সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে না এবং শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়েই কাউকে ঝরে পড়তে হবে না।
সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতে এবারই সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বাজেট আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
এ সময় সরকারের শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে তাদের সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু মাধ্যমিক শিক্ষা খাতেই প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান ও ৩ লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্যের কথা স্বীকার করে তারেক রহমান বলেন, সর্বত্র শিক্ষার্থীরা যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা সংস্কারে সরকারের ভাবনা সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানকে শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন অবশ্যই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।’ সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
শিক্ষকতা প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে: বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুযোগ ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষকতা কখনোই শেষ ভরসার পেশা বা আর দশটি সাধারণ চাকরির মতো হতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার চায় মেধাবী মানুষ শিক্ষকতাকে তাদের কর্মজীবনের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিক। রাষ্ট্র ও সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা রাষ্ট্রের নিজের মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, এ বছর থেকে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অন্তত একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো নিশ্চিত করতে।
১০২ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা: বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে সরকার।
গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের হাতে ক্রেস্ট, সম্মাননাপত্র ও দুই লাখ টাকা করে তুলে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের সম্মাননা দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। এছাড়া বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী- প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এ বছর মোট ১০২ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্মাননা পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ (মরণোত্তর), ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলামসহ (মরণোত্তর) বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা।
চিকিৎসা শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য সাবেক ইএনটি সার্জন অধ্যাপক ডা. এম এ মাজেদ (মরণোত্তর) এবং অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তারকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান (মরণোত্তর) এবং ড. এ.বি.এম. হারুন-উর-রশিদ সম্মাননা পেয়েছেন।
বিশেষ ক্যাটাগরিতেও সম্মাননা পেয়েছেন কয়েকজন শিক্ষাব্রতী। ১৯৭৪ সাল থেকে বিনামূল্যে শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘এক টাকার শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিত মো. লুৎফর রহমান, ‘রমনী কান্ত পাঠশালা’র রমনী কান্ত বেপারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় অবদানের জন্য প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশনের সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খান এ তালিকায় রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পৃথক বিচারক ও সার্চ কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই শেষে এসব শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের অঙ্গীকার: সরকার দেশের সর্বত্র পরিকল্পিত ও বিকেন্দ্রীভূত নগর উন্নয়নের পাশাপাশি সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘সর্বজনীন আবাসন, টেকসই নগরায়ণ’ প্রতিপাদ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ আবাসন এবং মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা বা সর্বজনীন আবাসন নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। সরকার এই অধিকার নিশ্চিত ও সুরক্ষিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার দেশের সিটি করপোরেশন ও জেলাগুলোর জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তারেক রহমানের মতে, আবাসনকে শুধু একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখলে হবে না; বরং নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন, গণপরিবহন, উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ পরিবেশসহ একটি সমন্বিত জীবনযাপনের পরিবেশ হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘নাগরিকদের জন্য শুধু একটি বাসস্থানই নয়, বরং সেটিকে নিরাপদ ও টেকসই করাও এখন সময়ের দাবি।’
প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সব নাগরিকের জন্য এ ধরনের আবাসন নিশ্চিত করা বেশি কঠিন। তিনি বলেন, ‘তবুও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
শহরের ওপর চাপ: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশজুড়ে শহর, নগর ও নগরকেন্দ্রগুলোতে জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। যেকোনো মানদণ্ডেই এখন ঢাকা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে রয়েছে। দেশের অন্যান্য বড় শহরও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য সর্বজনীন আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান এ-ও বলেন, এসব লক্ষ্য নির্ধারণের মতো এগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ নয়, বিশেষ করে দেশের বিদ্যমান বাস্তবতার কারণে। তারপরও সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাস্টারপ্ল্যান, সেকেন্ডারি টাউনশিপ: ঢাকা ও অন্যান্য শহরের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের মধ্যে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে সরকার শহরাঞ্চলের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধা বাড়াতেও সরকার কাজ করছে, যাতে শহরের বাইরে উন্নত সুবিধা নিশ্চিত করে নগরকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কমানো যায়।
অতীতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে এবং বিকেন্দ্রীভূত ও ভারসাম্যপূর্ণ নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ও বিকেন্দ্রীভূত নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন করতে হবে, যাতে সব এলাকায় উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন উদ্যোগের পাশাপাশি ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে, যা এসব এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ সহজ করতে সহায়তা করবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১ নম্বর লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে। এ লক্ষ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই শহর ও জনপদ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার আহ্বান: নগরাঞ্চলের আবাসন সংকট মোকাবিলা শুধু সরকারের পক্ষে কঠিন হবে উল্লেখ করে এ জন্য আবাসন খাতের বড় উদ্যোক্তা ও অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও মত দেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, আবাসনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মৌলিক সেবাসহ সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের অংশীজনরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বৃহত্তর নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার ব্লকভিত্তিক আবাসন প্রকল্প, এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ এবং নির্ধারিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে।
সরকারের পরিকল্পনাগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। পরে তিনি বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমাদ সোহেল মঞ্জুর, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনিয়াসহ অন্যরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

