Logo

রাজনীতি

‘ইসলামী আন্দোলন’ প্রার্থীরা ‘সংসদে যেতে’ রাজি হননি যে ৭ কারণে

Icon

শহিদুল ইসলাম কবির

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫, ২০:০৪

‘ইসলামী আন্দোলন’ প্রার্থীরা ‘সংসদে যেতে’ রাজি হননি যে ৭ কারণে

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘যারা পিআর পদ্ধতি নিয়ে গোঁ ধরছেন, তারা সাধারণত নির্বাচন দেখে ভয় পাচ্ছেন। তাদের নির্বাচনে ভয় পাওয়ার বাস্তব কারণও আছে। অনেক ইসলামী দল আছে, যাদের প্রার্থীরা কখনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। এর মধ্যে অন্যতম ইসলামী আন্দোলন।’ 

দুদু সাহেবের কথা থেকে যদি শুরু করি, তবে বলতে হয়— দেশের সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের বক্তব্য হচ্ছে, আপনারা অদৃশ্য কোনো কারণে যেমন পিআর পদ্ধতিকে ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনাদের তো ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে? দেশকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সিন্ডিকেটমুক্ত করে মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনার দল রাজি হচ্ছে না কেন? ভয় তো আপনার দল বিএনপিই পাচ্ছে। যেমন ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির বিষয়ে আপনার নেত্রী বলেছিলেন— ‘তিন পাগলের আবিষ্কার তত্ত্বাবধায়ক সরকার।’ সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে বিগত ১৭ বছর আন্দোলন করেছেন। আবার ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে কলুষিত করে এক-এগারোর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন।

আপনি বলেছেন— ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা কখনো নির্বাচিত হতে পারেননি। কেন নির্বাচিত হতে পারেননি, তা নিশ্চয়ই জনাব শামসুজ্জামান দুদুসহ দেশের মানুষের অজানা নয়। তারপরও আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—

প্রথম কারণ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সব নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা মেনে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। যা আপনার দলসহ অন্যরা করেননি। যেমন— নির্বাচন কমিশন একজন প্রার্থী নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু অতীতে যারা সংসদে গিয়েছেন, তাদের ৫% কি নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা মেনে নির্বাচনী খরচ করেছেন— আপনি বলুন।

দ্বিতীয় কারণ : অতীতে যারা সংসদে গিয়েছেন, তাদের ৯০-৯৫% সদস্য বা তাদের দলের লোকেরা কালোটাকা ছড়িয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থকরা কালোটাকার মালিক নন এবং কালোটাকা ছড়িয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। এটা প্রকৃতপক্ষে অবৈধ কর্মকাণ্ড।

তৃতীয় কারণ : আপনার দলসহ অন্য দলের যারা সংসদে গিয়েছেন, তাদের সিংহভাগ সদস্য পেশিশক্তির প্রদর্শন ও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল— এই দল পেশিশক্তির লালন-পালন ও ব্যবহারকে সমর্থন করে না।

চতুর্থ কারণ : যারা সংসদে গিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে বা যেসব বেনিফিসিয়ারি ছিলেন, তারা সংসদ সদস্য প্রার্থীর অর্থে হাজার হাজার টাকা দিয়ে ভোট কেনার উদাহরণ রয়েছে।

পঞ্চম কারণ : প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেওয়া ও ভোট কাটা— এভাবে অন্যের রায় ছিনিয়ে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এসব চর্চা করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কখনো চায়নি; ভবিষ্যতেও এমন কিছু করবে না।

ষষ্ঠ কারণ : লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সকল দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ ও আচরণ থাকা উচিত। কিন্তু দলীয় প্রভাব, কালোটাকার ছড়াছড়ি ও পেশিশক্তির কারণে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে না। যার কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও হাতপাখা মার্কার প্রার্থীরা নির্বাচিত হতে পারেননি।

এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের পূর্বের তফসিলে যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, সেই নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তৎকালীন মহাসচিব মাওলানা নুরুল হুদা ফয়েজীর প্রার্থীতা প্রত্যাহার করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করার ঘটনা ঘটেছে। বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য মানুষকে এলাকা ছাড়া করার উদাহরণ অতীতে সৃষ্টি করেছেন তারাই তো এখন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা শুনে ভীত হয়ে প্রতিনিয়ত যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন।

সপ্তম কারণ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেবল সংসদ সদস্য হওয়া, বিরোধী দলে থাকা বা ক্ষমতার অংশীদারিত্বের জন্য রাজনীতি করলে হয়তো অতীতে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সংসদে দলের প্রতিনিধি পাঠাতে পারত। তখন দুদু সাহেব আজকের মতো কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও কালোটাকার ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্র গড়তে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ কারণে যেসব দলের সিংহভাগ নেতা-কর্মী সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিসহ অপরাধের সাথে জড়িত— তাদের সাথে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অতীতে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে— নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেক ভোটারের ভোটের মূল্যায়ন এবং সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য পিআর পদ্ধতির নির্বাচন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে বিএনপি কেন ভীত হয়ে বিরোধিতা করছে— তার কারণ হিসেবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই পদ্ধতির নির্বাচন হলে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা কাজ করতে তেমন আগ্রহী হবেন না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য প্রার্থীরা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অর্থ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মাঠে সক্রিয় রাখেন। পিআর পদ্ধতির নির্বাচন হলে এক্ষেত্রে একটি সমস্যার সৃষ্টি হবে বলে তাদের আশঙ্কা।

লেখক : সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর