Logo

মতামত

শিশুর মানসিক বিকাশে সংস্কৃতি চর্চা

মেহেদী হাসান শোয়েব

মেহেদী হাসান শোয়েব

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৭

শিশুর মানসিক বিকাশে সংস্কৃতি চর্চা

আমরা প্রায়শই বলি, শিশুই ভবিষ্যৎ। এ তো কেবল বলার জন্য বলার বিষয় বা কেবল একটি স্লোগান নয়, এটা আমাদের জাতীয় জীবনের নৈতিক অঙ্গীকার হওয়ার কথা ছিল। শিশুর মানসিকতা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হলেই সত্যিকার অর্থে আমরা সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করতে পারি। শিশুর বিকাশ বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি, বড় হওয়া এবং জীবনে চলতে, বলতে শেখা। তো, শেখা বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শেখা মানে পাঠ্যবইয়ের মুখস্থ বিদ্যা নয়; শেখা মানে হলো কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলা, নিজের মতো ভাবতে পারা আর সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা। খেলার মধ্য দিয়ে নিয়ম-ছন্দ-সম্পর্ক বোঝা, গান-নাচ-আঁকাজোঁকার ভেতর দিয়ে রূপ-সুর-তাল চিনে নেওয়া, গল্প-কবিতার ভেতর দিয়ে ভাষার সৌন্দর্য ও জীবনবোধের সন্ধান পাওয়া— এভাবে যে শেখা তা গভীরতর হয়। সত্যজিৎ রায়ের গল্পে যে শিশু রোবট বলেছিল— ‘A child must play’— তার মর্মার্থ এতটাই স্পষ্ট যে সেখানে কোনো দ্বিধা নেই : ‘শিশুকে খেলতেই হবে’। কারণ খেলা তার স্বভাব, আর সেই স্বভাবই তার শেখার সবচেয়ে বড় দরজা।

শিশুর মন নিতান্ত সরল-সহজ। সেই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বিপুল সম্ভাবনা। গ্রামে এখনও বহু শিশু দারিদ্র্যের লাঞ্ছনার ভেতরে থাকলেও তারা পায় মস্ত প্রান্তর, বিশাল আকাশ, শালবনের ফাঁকে পাখির কূজন, ধানের গন্ধ, কাদামাটি— সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত প্রকৃতি। সেখানে তাদের কল্পনার ডানা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেলার সুযোগ কিছুটা মেলে। যদিও সেখানেও নানা সীমাবদ্ধতা আছে, সেসব অস্বীকার করার উপায় নাই। তবুও গ্রামে এখনও প্রাণের সঞ্চারটুকু অবশেষ আছে একরকম। এর বিপরীতে শহরে ইট-কংক্রিটের চার দেয়ালের ভেতর, নির্ধারিত রুটিনের জালে, কোচিং-কেন্দ্রিক ব্যস্ততায় শিশুর দিন শুরু থেকে রাতের শেষ পর্যন্ত বন্দিজীবনের মতো কাটে।  জানালার ওপারে আকাশ থাকলেও সেই আকাশের মেঘ-রঙে দৃষ্টি মেলার অবসর মেলে না। তার মনের অন্দরে বৃষ্টি-ছিটাও পৌঁছে না তাই। অথচ এই বন্দিত্বের বাইরেই রয়েছে বড় জীবন, মুক্ত জীবন; যেখানে আছে নিজের মতো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

তাহলে নাগরিক শিশুর মানসিক বিকাশের উপায় কী? প্রথমত, নিজের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর বুনিয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। বিকাশের বয়সের শুরুতেই যদি তার পরিচয় ঘটে ভালো গান, ভালো গল্প, ভালো কবিতা, ছবি, তাল-ছন্দের সহজ অনুশীলনের সঙ্গে; মনীষীদের জীবনকথা, মুক্তিযুদ্ধসহ আমাদের গৌরবের ইতিহাস; নদী-সবুজ-ঋতুবদল, প্রাণ-প্রকৃতির নানা আশ্চর্য বিষয়ে— তাহলে সেই শিশুর মনের জগৎ হয়ে উঠবে সমৃদ্ধ ও আলোকিত। এই পরিচয় তাকে শেখাবে সৌন্দর্যবোধ, সম্পর্কবোধ, দায়িত্ববোধ— যা পরিণত বয়সে নৈতিকতার ভিত হয়ে দাঁড়াবে। আবার বিশ্বসংস্কৃতির নানা বিষয়ও তার জানা দরকার— যাতে সে শেকড়ের জ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে দিগন্তজ্ঞান অর্জন করতে পারে; বাঙালি পরিচয় বুকে রেখে বিশ্বমঞ্চে আত্মবিশ্বাসী হয়ে চলতে শেখে।

এ কথা বললে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে— স্কুলকলেজ বা প্রচলিত বিভিন্ন অ্যাকাডেমির ভূমিকা এসব ক্ষেত্রে কেমন? আমরা দেখছি, শাসন আর নিয়মের বেড়াজালে অনেক প্রতিষ্ঠান শিশুদের একরকম বন্দিজীবনেই রাখছে। ফলাফল-নির্ভর প্রতিযোগিতা, নম্বর-প্রধান পাঠ, ‘ভালো ছেলে-মেয়ে’ হওয়ার সংকীর্ণ গৎবাঁধা সংজ্ঞা— এসব মিলিয়ে সৃজনশীলতা, কৌতূহল, ভাবুকতা এবং স্বপ্নদর্শনের জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। কিন্তু শাসনের এই কঠিন আবরণই কি শিক্ষার আসল রূপ হতে পারে? শিক্ষা তো আসলে জীবনকে জানা, মানুষকে বোঝা, বিশ্বজ্ঞানকে স্পর্শ করার এক ধারাবাহিক যাত্রা। সেই যাত্রার পরিবেশ হওয়া চাই এমন যেন তা হয়ে ওঠে এক ‘আনন্দআশ্রম’— যেখানে শিশুর নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা হবে, তার মনোভূমির স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা লালিত হবে, মানুষে মানুষে সম্পর্ক চর্চার জায়গা তৈরি হবে। তবে এও গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে কোনো অবাধ বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়; বরং দেশীয় সংস্কৃতি থেকে পাওয়া মূল্যবোধের এক মসৃণ সীমারেখা থাকতে হবে। একে বলা যেতে পারে ‘আপন-সংস্কৃতিজাত শৃঙ্খলা’ : ভয় নয়, ভালোবাসা আর মূল্যবোধের বন্ধনে বাঁধা থাকা; জবরদস্তি নয়, অন্তঃপ্রেরণায় শৃঙ্খলাবোধ শেখা।

কেমন হতে পারে এই ‘আনন্দআশ্রম’? এটা হতে পারে এমন একটি পরিসর, যেখানে খেলার মাঠই প্রথম পাঠশালা। সকালে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হাঁটতে হাঁটতে, পথে পথে পাতা-গাছ চেনা, পাখির ডাক শোনা। ফিরে এসে গোল হয়ে বসে গল্প শোনা— কখনও কোনো মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকথা, কখনও লোকসংস্কৃতির গল্প। দুপুরে তাল-ছন্দের অনুশীলন, বিকেলে মুক্ত আঁকাজোঁকা। সপ্তাহে অন্তত একদিন হবে ‘পরিচয় দিবস’— কোনো মনীষীর জীবনকথা বা কোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়। মাসে অন্তত একদিন ‘প্রকৃতি ভ্রমণ’— নদীর ঘাটে, পার্কে, কাশফুলের মাঠে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি দেখা। মাঝে মাঝে হবে ‘সম্পর্ক উৎসব’— শিশুরা নিজ হাতে বন্ধুদের জন্য ফল-ভাত ভাগ করে দেবে; এই ভাগাভাগির মধ্যেই সম্পর্কবোধের প্রথম পাঠ।

শ্রেণিকক্ষে তখন কী হবে? সিলেবাস থাকবে, পরীক্ষা থাকবে— কিন্তু সেগুলো শিশুস্বভাবের স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ভুল করলে বকুনি নয়, বরং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং প্রশ্ন করাকেই শেখার কেন্দ্রবিন্দু করা হবে। বইয়ের বাইরেও ‘জীবনের বই’ খোলা থাকবে। শিশুরা জানবে : গাছ কীভাবে শ্বাস নেয়, মৌসুম কীভাবে বদলায়, নদী কেন বাঁক নেয়, গান কেন হৃদয়কে নরম করে, ছন্দের আনন্দ কেমন। এই শেখার ভিতই একদিন তাদের গবেষণাগার, স্টুডিও, কর্মশালা কিংবা সামাজিক নেতৃত্বের জায়গায় সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

পরিবার ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পরিবারে ঘরে অন্তত একটি বইয়ের কোণ থাকুক— অন্তত দশ-বিশটি বই শিশুতোষ বই থাকুক সেখানে। শিশু দিনে একবার কিছুসময় যেন সেগুলো নেড়েচেড়ে পাতা উল্টে দেখে, পড়ে সেই উৎসাহ দিতে হবে। রাতে শোবার আগে গল্প বলার অভ্যাস থাকুক— মা-বাবার শৈশব, দাদু-নানুর সংগ্রামের গল্পও হতে পারে। টেলিভিশন, মোবাইল— আজকের দিনে এসব তো থাকবেই। একে নিষিদ্ধ করা যাবে না, তার দরকারও নেই। তবে তাতে সীমারেখা থাকবে, অভিভাবকের নজরদারি থাকতেই হবে। আর শিশুরা জানবে— পর্দার বাইরেই সত্যিকারের দুনিয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখানোর পাশাপাশি বোঝাতে হবে— এ উৎসব আমাদের সহাবস্থানের প্রতীক। পরিবারের ক্ষুদ্র কাজে শিশুদের ছোট ছোট দায়িত্ব দিতে হবে— গাছে পানি দেওয়া, বই গুছিয়ে রাখা, অতিথিকে পানি এগিয়ে দেওয়া। এই দায়বোধই ওর ভেতরে মানবিকতার ভিত তৈরি করবে।

সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সংস্কৃতি চর্চার যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় ভালো প্রতিষ্ঠান এখনো অপ্রতুল। তাই যার যেখানে অবস্থান, সেখান থেকেই ভূমিকা রাখা জরুরি। পাড়ায় সপ্তাহে এক বিকেলে পাঠচক্র, মাসে একদিন কোনো শিল্পীর কর্মশালা, খেলাধুলা আয়োজন এবং জয়-পরাজয়ের চেয়ে সহমর্মিতা উদ্‌যাপন— এসব ছোট ছোট উদ্যোগেই একসময় আসতে পারে বড় পরিবর্তন। শহরের কর্তৃপক্ষ মাঠ-উদ্যান রক্ষা করলে, স্কুল-কলেজগুলো সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে মূলধারায় আনলে, স্থানীয় সংগঠনগুলো একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করলে এ কর্মযজ্ঞ স্থায়ী রূপ নেবে।

এসব কথা যত সহজে বলে ফেলা গেল, বাস্তবায়ন যে সহজ কাজ নয়, তা আমরা জানি। বহু বছরের প্রচলিত পথে হাঁটতে হাঁটতে নতুন রাস্তায় নামা— এ এক বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাটাই আসল কাজ। পরীক্ষার ‘রেজাল্ট’কে একমাত্র মানদণ্ড ভাবা মানসিকতা থেকে বের হয়ে ‘মানুষ হয়ে ওঠা’কে শিক্ষার গন্তব্য করতে সাহস লাগে। তবে, মনে রাখা দরকার, শিশুর মন কোনো প্রকল্প নয়। একে জিপিএ ৫ পাইয়ে উন্নত করার নেশায় ছোটা কোনো মানবিক আচরণ নয়। বরং শিশুমনে ধৈর্য, তাল, ছন্দ, সৌন্দর্যের পুনরাবৃত্ত অনুশীলনে গড়ে ওঠে ওর ইতিবাচক চরিত্র।

আবার বলি— শিশুই ভবিষ্যৎ। তাই শিশুর বিকাশকে কেবল ‘ক্যারিয়ার প্রস্তুতি’ হিসেবে নয়, দেখতে হবে মানুষ হয়ে ওঠার এক যাত্রা হিসেবে। বাঙালি পরিচয়ের উষ্ণতা, বাংলা ভাষার মাধুর্য, লোকসংস্কৃতির রং, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস— এসবের সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির মুক্ত জানালা খুলে দিয়ে যদি শিশুদের বড় করি, তারা আত্মবিশ্বাসী হবে, মাথা উঁচু করে বিশ্বে চলতে শিখবে। তখনই আগামী প্রজন্মের হাতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সত্যিকারের সোনার বাংলা— যেখানে শিক্ষা হবে আনন্দ, শৃঙ্খলা হবে অন্তঃপ্রেরণা, আর সম্পর্ক হবে ভালোবাসার বন্ধনে গাঁথা। 

সকলে মিলে আনন্দ-কর্মযজ্ঞের ভেতর দিয়ে মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার সাধনায় মেতে ওঠাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মেহেদী হাসান শোয়েব : লেখক, প্রকাশক, বিতার্কিক; শিফট ইনচার্জ, বাংলাদেশের খবর

  • বাংলাদেশের খবরের মতামত বিভাগে লেখা পাঠান এই মেইলে- bkeditorial247@gmail.com 
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর