গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
‘জান দেব, জুলাই দেব না!’
— শহীদ ওসমান হাদি
জুলাই অভ্যুত্থানের এই অমোঘ স্লোগানটি ছিল আত্মত্যাগের চূড়ান্ত শপথ। কিন্তু আজ সেই রক্তস্নাত জুলাইয়ের স্পিরিটকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কার্যত নির্বাচনী গণিতের ছকে ফেলে রাজনৈতিক সমঝোতায় পর্যবসিত করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, যা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ পনেরো বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনেরই শুধু অবসান ঘটেনি; কার্যত রাষ্ট্রব্যবস্থাই সেখানে ভেঙে পড়ে; যা রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন ও একটি নতুন রাজনৈতিক পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরু থেকেই নিজেকে জুলাই স্পিরিটের ‘অতন্দ্র প্রহরী’ এবং ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকার’ হিসেবে দাবি করে আসছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই দলটির সাম্প্রতিক কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে অস্বচ্ছ উপায়ে নির্বাচনী সমঝোতা এবং আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত, দলটির ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
আদর্শিক আত্মসমর্পণ
এনসিপির মূল শক্তি ছিল দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিবিমুখ ছিল। তাসনিম জারা, যিনি একজন চিকিৎসক এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছিলেন, তার মতো পেশাজীবীদের এনসিপিতে যোগদান প্রমাণ করে যে, দলটি মেধা পাচারের বিপরীতে মেধা প্রত্যাবর্তনের একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে, নির্বাচনের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হয়ে দলটির নেতৃত্ব তাদের তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচন করার যে ঘোষণা নাহিদ ইসলাম নভেম্বরে দিয়েছিলেন, তা ডিসেম্বরের বাস্তবতায় ফিকে হতে শুরু করে।
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর এক প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন, যা দলটির অভ্যন্তরে এবং সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রেস কনফারেন্সে নাহিদ ইসলাম জোটের পক্ষে যেসব যুক্তি পেশ করেছেন, তা জুলাই স্পিরিট এবং এনসিপির নিজস্ব ঘোষিত ইশতেহারের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে ঠুনকো ও অসার বলে প্রমাণিত হয়। তার বক্তব্যের প্রধান দিকগুলো নিচে খণ্ডন করা হলো—
১. আদর্শিক ঐক্য নয়, নির্বাচনী সমঝোতা
নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন যে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো আদর্শিক ঐক্য হয়নি, এটি কেবল একটি ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ মাত্র, যা আসন্ন নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য প্রয়োজন। এনসিপির জন্মের মূল ভিত্তিই ছিল আদর্শিক রাজনীতি। তারা দাবি করেছিল যে তারা প্রচলিত ‘ক্ষমতা দখলের রাজনীতি’ নয়; বরং ‘ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি’ করবে। যখন একটি দল জামায়াতের মতো একটি ক্যাডার-ভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট ধর্মীয়-রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী দলের সঙ্গে জোটে যায়, তখন সেই দলের স্বতন্ত্র পরিচয় আর অবশিষ্ট থাকে না। বিশেষ করে যেখানে এনসিপি ‘বহুত্ববাদী প্রজাতন্ত্র’ এবং ‘মধ্যপন্থা’র কথা বলেছিল, সেখানে জামায়াতের মতো ‘থিওক্র্যাটিক’ ঝোঁক সম্পন্ন দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করা মানেই হলো তাদের মূল আদর্শকে বিসর্জন দেওয়া। নির্বাচনে জেতা যদি একমাত্র লক্ষ্য হয়, তবে জুলাইয়ের শহীদদের সেই স্লোগান— ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’-এর মর্যাদা কোথায় থাকে? এটি আসলে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা।
২. আধিপত্যবাদী শক্তি দমনের অজুহাত
নাহিদ ইসলাম এবং এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘এক্সিস্টেনশিয়াল থ্রেট’ বা অস্তিত্বের সংকট হিসেবে উপস্থাপন করেন। ২৮ ডিসেম্বর জোট গঠনের পর সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদির প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। এ ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে, আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তিগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে... এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বৃহত্তর জোটের প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করেছি।’
তারা যুক্তি দেন— প্রথাগত এবং সুসংগঠিত ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তির (আওয়ামী লীগ) মোকাবিলার জন্য এনসিপির মতো নবীন দলের একক সাংগঠনিক শক্তি যথেষ্ট নয়। তাদের মাঠপর্যায়ে পেশিশক্তি এবং ক্যাডারভিত্তিক সুরক্ষা প্রয়োজন, যা জামায়াতে ইসলামীর রয়েছে। তাই এই জোটকে তারা ‘আদর্শিক’ না বলে ‘নির্বাচনী’ বা ‘কৌশলগত’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেন।
রাজনৈতিক সহিংসতা বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আদর্শিক দৃঢ়তা এবং জনসমর্থন প্রয়োজন, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতা কোনো পুরনো দলের জোটে গিয়ে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেনি, তারা তাদের অদম্য সাহসের ওপর ভর করে বিজয়ী হয়েছিল। ওসমান হাদীর শাহাদাতকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াতের আশ্রয়ে যাওয়া মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়। এনসিপি নেতৃত্ব আসলে তাদের নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ঢাকতে এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা পেতে জামায়াতের ক্যাডার শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফ্যাসিবাদের বিলোপের কথা বলে অন্য একটি পুরনো এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর অঙ্গীভূত হওয়া ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. ৩০ আসনে রফা
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম স্বীকার করেছেন, তারা প্রথমে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে চেয়েছিলেন এবং এবি পার্টি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে তাদের একটি বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান যখন ঘোষণা করেন যে এনসিপি তাদের জোটে যোগ দিয়েছে, তখন সেটি বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন মেরুকরণ নিশ্চিত করে। প্রাথমিকভাবে এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও, বাস্তবতার নিরিখে তারা জামায়াতের কাছে ৫০টি আসনের দাবি জানায়। তবে দরকষাকষির একপর্যায়ে তা ৩০টি আসনে নেমে আসে। জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং এনসিপি মিলে একটি ১০-দলীয় জোট গঠন করে। এই জোটে জামায়াত রয়েছে চালকের আসনে, আর এনসিপি তাদের ‘জুনিয়র পার্টনার’। আর এর মধ্য দিয়ে জামায়াত জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে নিজেদের পরিকল্পনা হিসেবে জনগণের সামনে জাহির করতে পারবে। বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় তা এরই মধ্যে লক্ষ্যণীয়।
এটি এনসিপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এক বিশাল প্রবঞ্চনা। এনসিপি সারা দেশ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আহ্বান করেছিল এবং একটি ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। হুট করে এই অবস্থান পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব আসলে তাদের তৃণমূল কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধ নন। নুসরাত তাবাসসুমের মতো নেতারা ঠিক এই কারণেই নিজেকে নিষ্ক্রিয় করেছেন, কারণ তাদের মতে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘বাংলাদেশপন্থা’ ও ‘স্বতন্ত্র পরিচয়’ গড়ে তোলার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি (মাত্র ৩০ আসন পাচ্ছে এনসিপি) করার মানে হলো এনসিপির অসংখ্য যোগ্য প্রার্থীকে বসিয়ে দেওয়া, যা দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎকে পঙ্গু করে দেবে।
জামায়াতের লাভ ও এনসিপির ক্ষতি
এই জোটে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যার সহযোগী হিসেবে সাংগঠনিক ভূমিকার কারণে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে অস্পৃশ্য এবং কোণঠাসা ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী এনসিপির সঙ্গে জোট গঠন করার মাধ্যমে জামায়াত কার্যত ‘জুলাই স্পিরিট’-এর বৈধতা লাভ করে। এটি তাদের জন্য একটি বিশাল ‘ইমেজ ওয়াশিং’ বা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে, এনসিপির জন্য এটি এক বিশাল ঝুঁকি। দলটি তাদের বহুত্ববাদী, প্রগতিশীল এবং মধ্যপন্থী ভোটব্যাংক হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। সামান্তা শারমিনের মতো নেতারা সতর্ক করেছিলেন যে, জামায়াত একটি ‘অনির্ভরযোগ্য মিত্র’ এবং তাদের সঙ্গে জোটের জন্য এনসিপিকে ‘চড়া মূল্য দিতে হবে’।
গণরাজনৈতিক ধারা থেকে বিচ্যুতি
ফ্যাসিবাদের বিলোপ কেবল একজন ব্যক্তিকে হটানো নয়; বরং সেই ব্যবস্থার সংস্কৃতিকে বদলে দেওয়া। এনসিপি এবং নাহিদ ইসলামের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যকেই নতুন মোড়কে ধারণ করতে শুরু করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের চেতনা ছিল বৈষম্যহীনতা। কিন্তু বর্তমান সরকার এবং এনসিপির সমর্থনে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে এক ধরনের ‘পছন্দমাফিক দায়মুক্তি’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওসমান হাদির খুনীসহ ৮০০ মামলায় জামিন নিশ্চিত হয় মাত্র চার ঘণ্টায়। এসবই বিদ্যমান বিচারবিভাগে ক্ষমতাশালী দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের আইনজীবী নেতাদের ইশারায় ও প্রভাবে হয়ে থাকে। আবার ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থানকে উস্কানি দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যান্য দেশের স্বার্থে পরিচালিত হওয়াটা কোনোভাবেই স্বতন্ত্র রাজনীতি নয়। আর সেটাই আমরা এনসিপির কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। ‘মুজিববাদ’ দমনের কথা বলা হলেও সাংস্কৃতিকভাবে এর পাল্টা বয়ান নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অনেক কার্যক্রম মানবাধিকারের মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ, যা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফ্যাসিবাদের একটি বড় অস্ত্র হলো রাজনৈতিক বিভাজন ও সুবিধাবাদী জোট। এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে হাত মেলায়, তখন তাদের ১৯৭১ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা বা মওদুদিবাদ ধারণ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে মাত্র কয়েকদিন আগে এনসিপি নেতারা জ্বলাময়ী ভাষণ ও ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন। এরপরও তাদের সঙ্গে জোটে যাওয়া কেবল ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ নয়; বরং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।
এনসিপির ভবিষ্যৎ কোন পথে
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তার সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেলেছে। নাহিদ ইসলাম হয়তো আশা করছেন, এই জোটের মাধ্যমে তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনে সংসদে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন নিশ্চিত করবেন এবং আওয়ামী লীগের ফিরে আসা রোধ করবেন। কিন্তু এর বিনিময়ে তাকে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা হলো দলের আত্মা বা সত্তা।
তাসনিম জারা, তাজনুভা জাবীন এবং বিক্ষুব্ধ ৩০ নেতার বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, এনসিপি আর সেই একক, অবিভক্ত বিপ্লবী সত্তা নেই যা চব্বিশের জুলাই মাসে রাজপথ কাঁপিয়েছিল। যদিও তারা তখন কোনো দলের অধীনে ছিলেন না। এনসিপি এখন আদর্শিকভাবে বিভক্ত এবং সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। যদি আগামী নির্বাচনে এনসিপি ভালো ফল করতে না পারে, তবে এই বিভক্তি আরও ত্বরান্বিত হবে এবং দলটি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। অন্যদিকে, যদি তারা জয়ীও হয়, তবুও জামায়াতের মতো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দলের ছায়াতলে থেকে তারা কতটুকু স্বাধীনভাবে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, এনসিপির এই সংকট কেবল একটি দলের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘তৃতীয় শক্তি’ বা বিকল্প ধারা তৈরির স্বপ্নের সংকট। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে আশার আলো দেখিয়েছিল, জামায়াতের সঙ্গে এই আপসকামী জোট সেই আলোকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
‘তৃতীয় শক্তি’র পুনর্গঠন
এনসিপি যেহেতু তার নৈতিক অধিকার এবং স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়েছে, তাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে থেকে একটি আপসহীন ও সত্যিকারের ‘বাংলাদেশপন্থী’ শক্তির উত্থান এখন সময়ের দাবি। আগামী দিনের লড়াই হবে এই সুবিধাবাদী তথাকথিত ‘বিপ্লবী’দের মুখোশ উন্মোচন এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংগ্রাম।
জুলাই স্পিরিট কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয়। জনগণের দাবি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার; রাষ্ট্রের পুনর্গঠন। জামায়াত বা বিএনপির মতো দলগুলো যখন কেবল নির্বাচনের ওপর জোর দেয়, তখন এনসিপির মতো দলগুলোর তাদের সুরে সুর মেলানো মানেই হলো গঠন বা নিদেনপক্ষে সংস্কারের পথকে রুদ্ধ করা। আগামী দিনের লড়াই হবে রাষ্ট্র গঠনের লড়াই। সেখানে নির্বাচন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু প্রধান নয়, অপ্রধান। এই গঠনের রাজনীতির মূলেই থাকবে রাজপথের আন্দোলন।
আগামী দিনে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হবে এমন একটি ঐক্য যা কোনো পুরনো মেরুকরণের অংশ নয়। ইনকিলাব মঞ্চের মতো সংগঠনগুলো যখন এনসিপির সমালোচনা করছে যে তারা ‘জুলাইকে কুক্ষিগত করেছে’, তখন বোঝা যায়, রাজপথ এখনো জাগ্রত। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাইয়ের শহীদদের রক্তকে যারা ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে এক নতুন গণজাগরণ অনিবার্য। শহীদ হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে যখন আবারও তীব্র শীতের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজপথে নেমে আসে, তখন বোঝা যায়, জুলাই আজও জাগ্রত।
জুলাই স্পিরিট বেঁচে থাকবে গ্রাফিতিতে, শহীদ আবু সাঈদ থেকে শহীদ ওসমান হাদির সাহসে এবং সেই গণমানুষের অভিপ্রায়ে, যারা একটি নতুন রাষ্ট্র গড়তে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। কোনো সুবিধাবাদী জোটের কাছে তা মাথানত করবে না। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা বাস্তবায়িত হবে এক নতুন, আপসহীন নেতৃত্বের হাত ধরে, যারা জুলাইয়ের রক্তকে কেবল একটি নির্বাচনী বৈতরণী হিসেবে দেখবে না। যারা গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের রাজনীতি করবে। পক্ষ-বিপক্ষ এখন আরও স্পষ্ট। প্রতিনিয়ত আরও স্পষ্ট হবে। একদিকে রয়েছে নির্বাচনবাদী রাজনৈতিক দল ও গং এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, যারা লুটেরা-মাফিয়াশ্রেণীর তল্পিবাহক; যারা এই ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর অপরদিকে রয়েছে সাধারণ জনগণ, সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা ও সৈনিকেরা; যারা গণশক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের লক্ষ্যে নতুন রাষ্ট্র গঠনের দিকে ধাবিত হবে। যত দিন যাবে রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে। কারণ একটা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ফ্যাসিস্ট নেতৃত্ব ছাড়া ঠিকঠাক চলতে পারে না। আর তাই এই ব্যবস্থার পতন অবধারিত।
শাহেরীন আরাফাত : সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
shaherin.arafat1@gmail.com

