Logo

মতামত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদকের বিস্তার রোধে করণীয়

Icon

রায়হান উল্লাহ

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪০

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদকের বিস্তার রোধে করণীয়

রোহিঙ্গা- এই শব্দটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন আর নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবে আরাকান অঞ্চলের অধিবাসী রোহিঙ্গারা বহু দশক ধরে নিপীড়ন, বৈষম্য ও নাগরিক অধিকারহীনতার শিকার। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের রাষ্ট্রবিহীন করে দেয়, ফলে দীর্ঘদিন তারা বৈশ্বিকভাবে অন্যতম নিগৃহীত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এমন পটভূমিতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন শুরু হয় সত্তরের দশকের শেষ দিকে। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের পর এক ধাক্কায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজার ও টেকনাফের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে ১২ থেকে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে- যা আমাদের উপর মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব : বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে- এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বিশাল জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে চরম চাপে ফেলেছে। কক্সবাজারের বিশাল বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে; পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে হাজার হাজার অস্থায়ী ঘর। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে।

এ ছাড়া সস্তা রোহিঙ্গা শ্রমের চাপ পড়ে স্থানীয়দের মজুরি কমে গেছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে- মানবপাচার, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক চোরাচালান, অপহরণসহ নানা অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশনসহ মৌলিক সেবায় অধিক চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সহায়তা কমে যাওয়ায় এই চাপ আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে সম্প্রতি।

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংকটের প্রভাব : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একসময় সক্রিয় ছিল ১৫০-২০০ আন্তর্জাতিক এনজিও। বর্তমানে ফান্ড সংকটের কারণে সেগুলো কমে মাত্র ৫-১০-এ নেমে এসেছে। খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, আশ্রয়সহ মৌলিক সেবায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, যা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

ফান্ড কমে যাওয়ায় ক্যাম্পে কর্মরত রোহিঙ্গা শ্রমিক ও কর্মচারীদের চাকরি হারাতে হচ্ছে। জীবিকার অভাবে তারা কেউ মানবপাচার, কেউ মাদক পরিবহন, কেউ সন্ত্রাসী গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে। নারীদেরও এই চক্রে টেনে নেওয়া হচ্ছে- যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। প্রতিদিন ক্যাম্পে মারামারি, খুন, চাঁদাবাজি, গ্রুপিং হচ্ছে। ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এই আর্থসামাজিক সংকট স্থানীয়দের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বেকারত্ব বাড়ছে, বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরাধচক্র এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় যুবকদেরও মাদক ব্যবসা বা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে ফেলছে। পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি, বন উজাড়, পানি দূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস- এসব সমস্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদকের বর্তমান চিত্র : কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন মাদকের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত ৪০টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে, যার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র ‘ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি’। মিয়ানমারের প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যক্তিসহ দুই দেশের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক এই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার ইয়াবা ও আইস সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চল ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এই মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোহিঙ্গা নারীরা, কিশোররা, এমনকি বয়স্ক পুরুষরাও পাচারকারীদের হাতে সহজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে পানের দোকান, ফার্মেসি, ঝুপড়িঘর- সব জায়গায় লুকিয়ে মাদক বিক্রি হয়। কমিশন ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই ঘটে সহিংসতা।

র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযান জোরদার হওয়ায় টেকনাফের অনেক স্থানীয় ইয়াবা কারবারি ক্যাম্পে গিয়ে লুকিয়ে আছে এবং রোহিঙ্গাদের দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে। মাদক ও অস্ত্র- এই দুইয়ের সমন্বয়ে ক্যাম্পগুলোতে ছোট বড় সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে, যারা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করছে।

অরক্ষিত ক্যাম্প, অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ : বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থী ক্যাম্পের মতো কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে কোথাও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণবেষ্টনী নেই। ফলে পাচারকারী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, অপরাধী বহিরাগতরা সহজেই ঢুকতে ও বের হতে পারে। সার্বিক ব্যবস্থাপনাও দুর্বল- যা মাদক বিস্তারের অন্যতম অনুঘটক।

মাদক বিস্তার রোধে যা করতে হবে : এ সংকট মোকাবিলায় কেবল অভিযান বা কয়েকজন পাচারকারী ধরা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী, সমন্বিত ও বহুমুখী জাতীয় পরিকল্পনা। মূলত তিনটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে- মাদকের সরবরাহ চেইন ভেঙে দেওয়া- মিয়ানমার সীমান্তে অত্যাধুনিক নজরদারি, সেন্সর, ড্রোন ও স্মার্ট টহল ব্যবস্থা চালু করা। সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা জোন তৈরি করা এবং পাহাড়ি রুটগুলো সিল করা।

মাদক ব্যবসার ‘গডফাদার’ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা। তাদের সম্পদ অনুসন্ধান ও বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা করা- কারণ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করলে তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে। দুই দেশের যৌথ সীমান্ত নজরদারি ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বাড়ানো- ক্যাম্পগুলোকে সুরক্ষিত ঘেরার আওতায় আনা; নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ-প্রস্থানের ব্যবস্থা। ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল উন্নয়ন- বায়োমেট্রিক নজরদারি, স্মার্ট কার্ড ইত্যাদির ব্যবহার বাড়ানো। প্রতিটি ক্যাম্পে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প, র‌্যাব ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা। ক্যাম্পভিত্তিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটি সক্রিয় ও সক্ষম করা। নারীদের নিরাপত্তা ও শিশুদের সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা।

রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রিত জীবিকা ও শিক্ষা নিশ্চিত করা- মাদক সমস্যা কমাতে হলে রোহিঙ্গাদের বিকল্প জীবনধারা তৈরি করা জরুরি। কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বল্প পরিসরের আয়ের কাজ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রাখা। নারী ও তরুণদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা বৃদ্ধি করা। শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে মানসিক সহায়তা, পরামর্শ ও যুব প্রোগ্রাম পরিচালনা করা। তাদের হতাশা কমাতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু রাখা।

আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে ফের সক্রিয় করা- রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান বাংলাদেশে নয় মিয়ানমারে। তাই আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান এই শক্তিগুলোর একমত অবস্থান তৈরি করা জরুরি। আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসে দীর্ঘমেয়াদী তহবিল নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা- রোহিঙ্গা সংকট শুধু ক্যাম্পেই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি ও সমাজেও প্রভাব ফেলছে। তাই- স্থানীয় জনগণের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা। বাজার নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি স¤প্রসারণ।

রোহিঙ্গা সংকট আজ আর শুধু মানবিক সমস্যা নয়- এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মাদক বিস্তার এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। তাই প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমাত্রিক পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ নৈতিকভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে- কিন্তু তাদের টেকসই সমাধান মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ছাড়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী কূটনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়ার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই জটিল সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে।

 লেখক : কবি ও সাংবাদিক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর