আরেকটা জরিপ মার্কেটে এসেছে, আর গণমাধ্যমগুলো শিশুসুলভ আচরণ শুরু করেছে। প্রতিবেদনগুলোর শিরোনাম পড়লে আপনার মনে হবে, দেশে ভোট এই জরিপের মাধ্যমেই হয়ে গেছে। ফলাফল জানতে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না।
খবরে বলা হচ্ছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি, জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভ নামে চারটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে এ জনমত জরিপ চালায়। ‘প্রি-ইলেকশন পালস : ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশি ইলেকটোরেট’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল আজ সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় কী, আগে-পরে কোনো দিন তারা এই ধরনের জরিপ করেছে কি না, জরিপটির তথ্যের যাচাইযোগ্যতা আছে কি না, সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা, ক্রসচেকের সুযোগ আছে কি না আর নমুনা আকার মাত্র ২২ হাজার হলে সেটি পুরো দেশের মতামতকে কতটা প্রতিনিধিত্ব করে—এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর নিউজে নেই। মাত্র ২২ হাজার মানুষ নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে— এই তথ্যটিও হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যমে আছে, তাও একদম শেষে, যেন সেটা গুরুত্বহীন কোনো খুঁটিনাটি।
জরিপের গভীরতা কতটুকু, সেটি এই অংশ পড়লে বোঝা যায়: বরিশাল বিভাগ থেকে ২,১৪১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৩,৯২৮, ঢাকা বিভাগ থেকে ৪,৮১৮, খুলনা বিভাগ থেকে ৩,১৭৮, ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে ১,২৪৪, রাজশাহী বিভাগ থেকে ২,৭৩৯, রংপুর বিভাগ থেকে ২,৭৩৬ এবং সিলেট বিভাগ থেকে ১,৩৯০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো, এই বণ্টন আদৌ দেশের জনসংখ্যাগত অনুপাত অনুযায়ী কি না— সেটির কোনো ব্যাখ্যাও নেই।
জরিপ কিংবা গবেষণা বিষয়ক প্রতিবেদন লিখতে গেলে সব সময় বাড়তি সতর্কতা দরকার। লাইনে লাইনে সন্দেহ তৈরি করতে হয়। কারা জরিপ করছে, গবেষণা হলে সেটি কোনো গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে কি না, হলে সেটি পিয়ার-রিভিউড কি না— এই তথ্যগুলো একদম শুরুতেই পাঠককে জানাতে হয়। এই জরিপ সংক্রান্ত কোনো সংবাদে এসবের কিছুই নেই।
জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ভৌগোলিক শহর-গ্রাম ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে স্ট্রাটিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন অনুসরণ করা হয়েছে এবং ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-স্ট্রাটিফিকেশন ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন আপনি নিউজ করলে পাঠককে অবশ্যই বলতে হবে, এই ‘স্ট্রাটিফায়েড স্যাম্পলিং’ মেথডোলজি বাস্তবে কী বোঝায় এবং এটি স্যাম্পল বায়াস কমাতে কতটা কার্যকর। আজকে একটা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এসবের ব্যাখ্যা নেই।
সোমবার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ফলাফলের কথা জানিয়েছে। তার মানে, এটি মূলত একটি বাইট-ভিত্তিক নিউজ ইভেন্ট, যেখানে আয়োজকেরা প্রেস রিলিজ ও ফ্যাক্ট শিট সরবরাহ করেছেন। বাইট থেকে নিউজ লেখাও যে একটা এডিটোরিয়াল আর্ট, সেটা নিশ্চয়ই আমাদের মিডিয়ার অনেক সিনিয়র সাব-এডিটর জানেন এবং পারেন। আমার প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলোর জায়গা কি নিউজরুমে এখনো আছে? না কি কম টাকায় এমন সব মানুষ নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা শুধু কপি-পেস্টে ওস্তাদ।
আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টাই ঠিক। এখন প্রায় প্রতিদিন আমাদের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো যেভাবে একের পর এক তথ্যগত জগাখিচুড়ি পাকাচ্ছে, তাতে এই সন্দেহ আর সন্দেহ নয়— প্রায় নিশ্চিত সত্য।
লেখক : ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, ভয়েস অফ আমেরিকা; এআই ও ডিজিটাল মিডিয়া ট্রেইনার
এমএইচএস

