Logo

মতামত

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ : ঐতিহ্যের দায় বনাম রূঢ় বাস্তবতা

মেহেদী হাসান শোয়েব

মেহেদী হাসান শোয়েব

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:০১

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ : ঐতিহ্যের দায় বনাম রূঢ় বাস্তবতা

প্রতীকী ছবি (এআই দিয়ে তৈরি)

অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি বার্ষিক বাণিজ্যিক আয়োজন বা বই কেনাবেচার স্থান নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত চেতনার এক সুগভীর প্রতিফলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাজপথ রাঙানো যে রক্ত শোষিত হয়ে বাংলার মাটি উর্বর করেছিল, সেই উর্বরতা থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের এই ‘প্রাণের মেলা’। চিত্তরঞ্জন সাহার এক চিলতে চটের ওপর সাজানো কয়েকটি বই থেকে শুরু করে আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল কর্মযজ্ঞ— এই দৃশ্যপটের পরতে পরতে মিশে আছে আমাদের জাতীয় আবেগ। কিন্তু ২০২৬ সালের বইমেলা ঘিরে আজ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের সামনে এক বেদনাদায়ক সংকট দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা আর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় মেলাটিকে এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তনের প্রহসন শেষে সর্বশেষ ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর ঘোষণা এলেও বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক বাস্তবতায় তা কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে না।

রমজান ও জনজীবনের পরিবর্তিত সমীকরণ
বইমেলা আয়োজনের পথে এবার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে পবিত্র রমজান মাস। পঞ্জিকার হিসেবে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হতে চলায় মেলার প্রায় পুরো সময়টিই সিয়াম সাধনার আবহে বন্দি থাকবে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় রমজান কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয়, বরং এটি জনজীবনের প্রাত্যহিক ছন্দ আমূল বদলে দেয় এই মাস। 

রমজান মাসে বিকেল থেকে শুরু হওয়া ইফতারের প্রস্তুতি এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ তারাবির নামাজ সাধারণ মানুষের অগ্রাধিকার তালিকায় বড় পরিবর্তন আনে। এছাড়াও দিনের বেলা রোজা রাখার ক্লান্তির পর যানজট ঠেলে মেলা প্রাঙ্গণে আসা কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও চ্যালেঞ্জিং। তদুপরি, রমজানের শেষার্ধে যখন নগরবাসী নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন এবং মধ্যবিত্তের বাজেটে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে ঈদের খরচের চাপ যুক্ত হয়, তখন বই কেনা অনেকের কাছেই ‘বিলাসিতা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। মানুষ কমে যাওয়া ঢাকা এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার এই টানাপোড়েনে বইমেলা তার প্রাণশক্তি হারাবে— যা আমাদের দীর্ঘ লালিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য এক বড় ধরণের অগৌরবের বিষয়।

নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা ও নিরাপত্তা
বইমেলা ঘিরে বিদ্যমান সংকটের সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনের কারণেই মূলত ঐতিহ্যগত চর্চা ভেঙে তারিখ বদলেছে বইমেলার। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, নির্বাচনের ঠিক পরবর্তী সময়গুলো প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। নির্বাচনের মাত্র আট দিন পর মেলা শুরু করার সিদ্ধান্তটি জননিরাপত্তার বিচারে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ক্ষমতার রূপান্তরকাল এবং প্রশাসনিক স্তরে যে ব্যাপক কর্মতৎপরতা তৈরি হয়, তাতে বইমেলার মতো বিশাল এক গণজমায়েতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নির্বাচন-পরবর্তী মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এত দ্রুত মেলার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা লজিস্টিক্যালিও জটিল। মনস্তাত্ত্বিকভাবেও নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ করার প্রবণতা কাজ করে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা সঙ্গী করে উৎসবের আমেজে ঘর থেকে বের হওয়া অনেকের জন্যই অনাগ্রহের হবে। সৃজনশীলতা চর্চার জন্য যে সুস্থ ও ভয়হীন পরিবেশ প্রয়োজন, নির্বাচন-পরবর্তী এই সংবেদনশীল সময়টি সেই পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব ও প্রকাশকদের জীবন-মরণ সংগ্রাম
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে বইমেলাকে কেবল একটি উৎসব মনে হলেও, সৃজনশীল প্রকাশকদের জন্য এটিই হলো সারা বছরের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার একমাত্র রসদ। অথচ গত কয়েক বছরে কাগজ, কালি ও মুদ্রণ উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপে প্রতিটি বই প্রকাশ করতে গিয়ে প্রকাশকদের যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তার বিপরীতে এবারের বইমেলা যদি পাঠক খরায় ভোগে, তবে শত শত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রকাশকদের বিভিন্ন অংশ সুনির্দিষ্ট দাবি ও আন্দোলনের পথে হাঁটছে। নির্ধারিত সময়ে মেলা না হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রকাশক ও সংস্কৃতিসেবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘অমর একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদ আগামী ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি চত্বরে একদিনের জন্য একটি ‘প্রতীকী বইমেলা’র ডাক দিয়েছে। এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা মূলত জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং প্রকাশকদের সংকট আমলে নেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারকদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাচ্ছে। 

পাশাপাশি, ‘বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’ নামে প্রকাশকদের আরেকটি অংশ মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য কতগুলো দাবিদাওয়া জানিয়ে বাংলা একাডেমিতে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্টল ভাড়া অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো, প্যাভিলিয়ন সংস্কৃতির নামে ছোট প্রকাশনীগুলোকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার বৈষম্য দূর করা এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী প্রকাশক’দের স্টল বরাদ্দ না দেওয়া।

জানা যাচ্ছে, অনেক ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান— যারা গত তিন-চার দশক ধরে নিয়মিত মেলায় অংশ নিয়ে আসছে— তারা এবার স্টল বরাদ্দ পাওয়ার আবেদনই করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যখন প্রকাশকরা বুঝতে পারছেন যে, রমজান মাসে পাঠকশূন্য মেলা করে স্টলের কর্মীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো সম্ভব নয়, তখন তারা মেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই ১ ফেব্রুয়ারির প্রতীকী মেলা কিংবা সমিতির এই দাবিদাওয়া আসলে নীতিনির্ধারকদের কাছে এই শিল্পের মুমূর্ষু অবস্থার এক চূড়ান্ত আর্তচিৎকার। বইমেলা যদি সত্যিই আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়, তবে সেই চেতনার ধারক-বাহক প্রকাশকদের এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে কোনোভাবেই সার্থক মেলা সম্ভব নয়।

বাংলা একাডেমির অবস্থান ও উত্তরণের পথ
বাংলা একাডেমি হয়তো ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং নিয়ম রক্ষার বিষয়টিকেই তাদের প্রধান দায় মনে করছে। তবে একাডেমির এই অবস্থানের পেছনে ঐতিহ্য রক্ষার সদিচ্ছা থাকলেও যে ঐতিহ্যে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই অনিশ্চিত, সেখানে কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ রক্ষা করা মেলার মূল দর্শনের পরিপন্থী। আর তারা যদি ঐতিহ্যের প্রতি এতটাই দায়বদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে ফেব্রুয়ারির ১ তারিখেই বইমেলা শুরু করা উচিত ছিল তাদের। মাঝে শুধু নির্বাচনের জন্য ১১-১৩ তারিখ, তিনদিন বন্ধ রাখলেই পারতো। সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস যেহেতু করেনি, তাই এখন ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে প্রকাশকরা অংশগ্রহণ না করলেও একাডেমি নিজ উদ্যোগে মেলা করবে— মহাপরিচালকের এমন গোঁয়ার বক্তব্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অস্বস্তি ও বিভাজন তৈরি করেছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথটি হতে হবে বাস্তবসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক

  • যৌক্তিক সময় নির্ধারণ : বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো রমজান এবং ঈদের ছুটি পরবর্তী সময়ে (সম্ভব হলে মে মাসের শুরুতে) একটি পূর্ণাঙ্গ ও উৎসবমুখর বইমেলার আয়োজন করা। এতে যেমন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, তেমনি মানুষ একটি সতেজ পরিবেশে মেলায় অংশ নিতে পারবে।
  • কাঠামোগত সংস্কার : প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচাতে স্টল ভাড়া অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো এবং প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে ছোট-বড় সব প্রকাশনীর জন্য মেলা প্রাঙ্গণকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা প্রয়োজন।
  • সমন্বিত মডেল : সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি এবং প্রকাশক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি জরুরি ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করে বর্তমান প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার নতুন রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

বইমেলা কোনো সাধারণ বার্ষিক একটা ইভেন্ট নয়। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই অমর একুশে বইমেলার চিরচেনা জৌলুস টিকিয়ে রাখতে পারে। এখনই সময় অহমিকা বিসর্জন দিয়ে একটি সুন্দর ও পাঠকবান্ধব মেলা উপহার দেওয়ার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার। 

মেহেদী হাসান শোয়েব : লেখক, প্রকাশক, বিতার্কিক; শিফট ইনচার্জ, বাংলাদেশের খবর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বইমেলা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর