Logo

মতামত

একটি নির্বাচনী বিতর্ক হতেই পারে

Icon

মো. খশরু আহসান

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫১

একটি নির্বাচনী বিতর্ক হতেই পারে

একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি। টেলিভিশনের পর্দায় হাজার কোটি মানুষের লক্ষ কোটি চোখ। যে দলগুলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, তাদের দলীয় প্রধানবৃন্দ নিজের দলের হয়ে অন্যান্য দলগুলোর সাথে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন। নিজেদের অবস্থানকে সামনাসামনি তুলে ধরবেন। ঠিক আমেরিকার প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের মতো এরকম একটি আয়োজনের প্রত্যাশা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের থাকতেই পারে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলকে এই ধরনের বেশ কিছু অনুষ্ঠান আয়োজন করতে দেখেছি। বেশ ভালো সাড়াও ফেলেছে অনুষ্ঠানগুলো। এই ধরনের সরাসরি বিতর্কের একটি বড় সুবিধা হলো, জনসম্মুখে ও প্রকাশ্যে সরাসরি দলীয় প্রধানদের অবস্থানের মাধ্যমে কে নিজেদের দক্ষতাকে কতটুকু প্রমাণ করতে পারছেন, সেটিও পরিষ্কার হওয়া যায়। একজন নাগরিক তার সকল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারেন এবং নাগরিক হিসেবে তিনি কাকে ভোট দেবেন, তা তিনি সহজেই নির্ধারণ করতে পারেন। অর্থাৎ সরকারের সাথে জনগণের একটি যোগাযোগ স্থাপন হতে পারে। প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে দলের প্রধানদের মুখোমুখি অবস্থানের মাধ্যমে নিজেদের পরিকল্পনা উপস্থাপনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা যায়।

নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের ইশতেহার প্রকাশ করার প্রচলন পৃথিবীতে বেশ পুরনো। খুব ভালোভাবে জরিপ করলে দেখা যাবে, এ দেশের অধিকাংশ মানুষই নির্বাচনী ইশতেহারে খুব বেশি বিশ্বাস রাখেন না। অবশ্য নির্বাচনী ইশতেহারের কার্যকারিতা অনেকটা নির্বাচন অবধিই দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের প্রচলন আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তেমন দেখা যায় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সেভাবে দেখিনি।

সারা বছরজুড়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে কিছু ‘স্পোক পার্সন’ থাকেন। তারাই মোটামুটি দলের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু এককভাবে আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে প্রায় সকলেই কথা বললেও, দলীয় প্রধানদেরকে একই মঞ্চে আমরা কখনো প্রকাশ্যে নিজের দলকে তুলে ধরার মতো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান দেখিনি। তবে এই সময়ে এই ধরনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন বেশ জরুরি হয়ে পড়েছে অনেকগুলো কারণে। এর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতা আনা এবং সরাসরি জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জনগণের মুখোমুখি হওয়া।

এক. আলাদা আলাদা করে সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় কথাগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরাটা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং সেখানে পাল্টা যুক্তি দেয়ার জন্য কোনো ভিন্নমতের মানুষ থাকেন না। কেননা এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলের 'স্ক্রিপ্ট রাইটার'রা করে থাকেন। অনেকটা সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয়া, মুখস্থ পড়ার মতো। এর পরিবর্তে আমরা বর্তমান প্রজন্ম আশা করি, দলীয় প্রধানরা সামনাসামনি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন এবং উত্তরের ক্ষেত্রে কতটুকু উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগাচ্ছেন সেটিও বিবেচনায় নেওয়া। অনেকটা তোষামোদির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় সমালোচনা করার মানুষ আমাদের এই বঙ্গে খুব একটা নেই। দল অনেক পরের কথা, আমাদের মধ্যে নিজেদের নিয়ে সমালোচনাকে মেনে নেয়ার ক্ষমতা এবং মানসিকতা দুটিই অনেক কম।

দুই. বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোর টকশোতে আমরা বিভিন্ন দলের 'স্পোক পার্সন'দেরকে বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু কথা বলতে শুনেছি, যা পরবর্তীতে দলকেই বিপদে ফেলে দিয়েছে। টেলিভিশনগুলোর টকশোও জরুরি। এসব অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা-সমালোচনাও উঠে আসে। তবে নির্বাচনের পূর্বে দলের প্রধানদের এমন বিশেষ বিতর্কের আয়োজন তাদের অবস্থানকে পরিষ্কার করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরো বেশি শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি তৈরিতে সহযোগিতা করে। এটি দলের জন্যও যেমন ভালো, জনগণের জন্যও ভালো। এ ধরনের বিতর্কে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতিসহ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসার সুযোগ থাকে অনেক বেশি।

তিন. দলীয় প্রধানরা যখন কথা বলবেন, সেখানে তাদের উপস্থাপিত যুক্তি-তর্কের মধ্যে কোনটি কতটুকু কার্যকরী; সেটি জনগণ আরো বেশ সহজেই বুঝতে পারবেন। একটি দলের দলীয় প্রধান যদি অযৌক্তিক কথা বলেন, সেই মুহূর্তেই আরেকটি দলের প্রধান তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। ফলে কোনো দলীয় প্রধান চাইলেই জনগণকে তথাকথিত আশার বাণী শোনাতে পারবেন না, এমনকি এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হোক সেটি তিনি চাইবেনও না। মঞ্চটি উন্মুক্ত থাকায় জনগণ কথার পিঠে কথা বলার সুযোগ পাবেন।

চার. জনগণ সরাসরি তাদেরকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন। আমাদের দেশে এই চর্চাটা বেশ কম। দেশের একজন সচেতন নাগরিক পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি ছাড়া তার প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসাগুলোকে সঠিক জায়গা অবধি নিয়ে যেতে পারেন না। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে, দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা দেশের নীতিনির্ধারক অনেকের চেয়ে দেশকে নিয়ে বেশি ভাবেন। প্রশ্ন করতে চান, জানতে চান। জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেককেই আটকে দেয়ার ক্ষমতা আছে, এমন মানুষের সংখ্যাও দেশে অনেক।

কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির চেয়ে আলোচনা-সমালোচনার পথ বেশি সুন্দর হয়। একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যিনি আমার ডেস্কে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাকে নানান ধরনের আশার বাণী কিংবা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেগুলো আদতে দিবাস্বপ্ন নাকি তার বাস্তব ভিত্তি আছে; সে কথা তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করার অধিকার আমারও আছে— এ কথাকে অযৌক্তিক বলাটা কতটুকু যৌক্তিক হবে তার উত্তর আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছেই আছে।

লেখক : নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর